লিখেছেন: চাঙমা চিক্কো
বৌদ্ধ ধর্ম বিষয়ে আলোচনা বা তর্কের সময় আমরা প্রায়ই বলে থাকি- বুদ্ধ বলেছেন “এসো দেখ”। এই “এসো দেখ উপনীত হও(এহিপস্সিকো ওপনাযিকো)” বলতে আসলে ঠিক কি বুঝানো হয়? এই দেখা কি কেবল চোখে দেখে ধর্ম গ্রন্থ অধ্যয়ন আর যুক্তি তর্কের আলোকে আলোচনা করে উপনীত হওয়াকে বুঝায়? লোকীয় দৃষ্টিতে সেই দেখাকে দেখা মনে হলেও বৌদ্ধিক দৃষ্টিতে সেটা পরিপূর্ণ দেখা নয়। এই দেখাটা চর্ম চক্ষু আর যুক্তি চক্ষু দিয়ে দেখার চাইতেও গভীরতর। আমরা খোলা চোখে(Naked eye) যা দেখি সেটাকে চর্ম চক্ষু দিয়ে দেখা বুঝায়। সাধারণভাবে পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্তের যথার্থ বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে অবরোহ বা আরোহ প্রণালী অনুসরণ দ্বারা কোন যৌক্তিক সিদ্ধান্তে বা অনুসিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াকে যুক্তি চক্ষু দিয়ে দেখা বলতে পারি যা প্রকারান্তরে চর্ম চক্ষুরই নামান্তর। মানুষের মত অনেক প্রাণী তাদের চোখ দিয়ে দেখতে পায়। চিল কিংবা বাজপাখির কথা আমরা জানি যারা মানুষের তুলনায় অনেক দূর থেকে সুক্ষ্মভাবে কোন বস্তুকে সনাক্ত করতে পারে। কবুতর মানুষের থেকেও বেশি সুক্ষ্মভাবে দেখে। পেঁচার চক্ষু আমাদের মানব চক্ষুর তুলনায় অনেক বেশি আলোক সংবেদনশীল এবং একারণে অন্ধকার রাতেও পেঁচারা দূর থেকে বিভিন্ন বস্তু সনাক্ত করতে পারে যা আমরা পারি না। সাপ রাতের বেলায় দেখতে পায়। তবে উঁই পোকাসহ অনেক প্রাণী আবার দেখতে পায় না।
বৌদ্ধ দর্শন অনুযায়ী দুঃখমুক্তির যে অষ্টমার্গ বা উপায় সেই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের প্রথম মার্গ হচ্ছে সম্যক দৃষ্টি। এই সম্যক দৃষ্টিকে আমরা অনেকেই সাধারণ অর্থে নিরপেক্ষ, নির্মোহ, বস্তুনিষ্ঠ ইত্যাদি দৃষ্টি হিসেবে হয়ত অভিহিত করতে পারি এবং এভাবে দেখাকেই সম্যক দৃষ্টিও বলতে পারি। বৌদ্ধ দর্শন মতে এসবই চর্ম চক্ষুর দেখা মাত্র। এর বাইরেও আরও দেখার আছে। বুদ্ধ বলেছেন চক্ষু ৫(পাঁচ) প্রকার। যথা- ১। চর্ম চক্ষু(Physical eye), ২। দিব্য চক্ষু(Heavenly eye), ৩। প্রজ্ঞা চক্ষু(Wisdom eye), ৪। ধর্ম চক্ষু(Dharma eye) এবং ৫। বুদ্ধ চক্ষু(Buddha eye)। এখানে চক্ষু বলতে আমরা সাধারণত কেবলমাত্র চর্ম চক্ষুকে বুঝে থাকি। কিন্তু বৌদ্ধ দর্শনে বুদ্ধের ভাষায় “চক্ষু” শব্দের অর্থ অনেক গভীর। কাজেই চক্ষু বলতে কোনমতেই কেবলমাত্র মানুষের চর্ম চক্ষুকে(Physical eye) মনে করা যাবে না।
০১। চর্ম চক্ষু(Physical eye): চর্ম চক্ষু সম্পর্কে ধারণা পেতে আমরা আধুনিক বিজ্ঞানের একটি তালিকা ব্যবহার করতে পারি যে তালিকার নাম বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন তড়িৎ চুম্বকীয় বর্ণালী(electromagnetic spectrum)।
ত্বড়িৎ চুম্বকীয় বর্ণালী বা Electromagnetic Spectrum
উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে যে মানুষের সাধারণ চোখে দৃশ্যমান তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ক্ষেত্র অত্যন্ত সীমিত এবং ক্ষুদ্র। মানুষ যন্ত্রের সাহায্য ছাড়া অতিবিগুনী রশ্মি(Ultra-violet Ray) থেকে এর পরের এক্স-রে(X-rays), গামা-রে(Gamma Rays) ইত্যাদি উচ্চ তরঙ্গগুলো যেমন দেখতে পায় না তেমনি ইনফ্রেয়ারেড রশ্মি(Infrared Ray) থেকে এর পরের মাইক্রোও তরঙ্গ(Micro-Waves), রেডিও তরঙ্গ(Radio Waves) ইত্যাদি নিম্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যগুলোও দেখতে পায় না। এর অর্থ এই যে মানুষ এই বিভিন্ন রকমের তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের তালিকা(Chart) আবিষ্কারের দ্বারা এখন যে বিশ্বব্রহ্মান্ধকে বিভিন্ন মাত্রায় জানতে পারছে এর পূর্বে মানুষ মনে করত মহাবিশ্ব সম্পর্কে সে যা কিছু জানতে পেরেছে সেসব বাস্তবিক, সম্পূর্ণ এবং সত্য তা আসলে ছিল অসম্পূর্ণ ও বিশ্বব্রহ্মান্ধের অতি ক্ষুদ্রতম অংশ মাত্র। এখন এই আবিষ্কৃত তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের তালিকার বাইরেও আরও তরঙ্গ আছে কিনা তা জানা যায়নি। যেমন- মহাবিশ্বের গুপ্ত পদার্থ(Dark Matter) ও গুপ্ত শক্তির(Dark Energy) অস্তিত্ব, তাদের ত্বরণ, ধর্ম ইত্যাদি আমাদের এখনো কেবল ভাবায় কিন্তু জানার পরিধির আওতায় আসেনি।
এই যে আমরা যেটুকু তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ খালি চোখে(naked eye) দেখতে পাই সেই দেখাটা আসলে কিভাবে ঘটে? আমরা এখন জানি কোন কিছু “দেখা” জিনিসটা ঘটে মূলত কোন বস্তুর উপর আলোর প্রতিফলনের কারণে। অর্থাৎ আমরা যা কিছু দেখি সেটা মূলত সেই দৃশ্যমান বস্তুর উপর আলো পড়ে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসার কারণে। একারণে আলো না থাকলে আমরা কোন কিছু দেখতে পায় না। আলো এক ধরণের তড়িৎ চুম্বকীয় শক্তি(Electro-Magnatic Energy)। আলোর নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের(specific wave length) ফোটন কণারা কোন বস্তুর উপর পড়ার পরে প্রতিফলিত হয়ে যখন আমাদের চোখের লেন্স(Lens) এর মাধ্যমে এসে ফোবিয়া এবং মাকুলা(Fovea & Macula) অংশে আঘাত করে অপটিক নার্ভ(Optic Nerve) দিয়ে মস্তিষ্কের(Brain) ভিজুয়েল কর্টেক্স(Visual Cortex) এ ইমেজ তৈরি করে তখনি কোন কিছু “দেখা’র” কাজটি ঘটে। ফোবিয়া অংশে রড কোষ এবং কোন্ কোষ(Rode cell & Cone cell) নামক দুই ধরণের রং সংবেদনশীল কোষ(Color Sensitive Cells) বিদ্যমান যে কোষগুলোর কারণে আমরা বিভিন্ন রং এর অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি। অনেক প্রাণী আছে যাদের এই কোষগুলো না থাকার কারণে বস্তুজগতকে কেবলমাত্র স্বল্প রং এমনকি সাদা-কালো রঙে দেখতে পায়। সে যাই হোক আমরা এখন বুঝতে পারলাম দেখার কাজটা মূলত নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যে চলা তড়িৎ চুম্বকীয় শক্তির সাহায্যে মস্তিষ্কে মেন্টেল ইমেজ(Mental Image) তৈরির প্রক্রিয়ায় ঘটে থাকে। আমাদেরসহ প্রাণী জগতে যাদের চর্মচক্ষু আছে তাদের এভাবেই বস্তুজগত দেখার কাজটা ঘটে থাকে।
তড়িৎ চুম্বকীয় সীমিত তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের দ্বারা আমাদের বস্তু জগত দেখা
০২। দিব্য চক্ষু(Heavenly eye): চর্ম চক্ষুর বা মানব চক্ষু দ্বারা দেখা এবং এই দেখার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমরা আধুনিক বিজ্ঞানের সাহায্যে সহজে বুঝতে পারলাম। এখন আসা যাক পঞ্চচক্ষুর দ্বিতীয় চক্ষু তথা দিব্য চক্ষু আলোচনায়। দিব্যচক্ষু বলতে অনেকেই দেবতাদের চক্ষুকে মনে করে থাকেন। কিন্তু বৌদ্ধ দর্শনে এই দিব্য চক্ষু দ্বারা দেখার ক্ষমতাকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। প্রখ্যাত বৌদ্ধ দর্শন গবেষক সি.টি.শেন (C.T.Shen) সহ অনেকেই মনে করেন দিব্যচক্ষুর দ্বারা দর্শন ক্ষমতা লাভ দুইভাবে সম্ভব যথা- ধ্যানের মাধ্যমে এবং আধুনিক যন্ত্রবিজ্ঞানের উদ্ভাবিত যন্ত্রের সাহায্যে। যেমন আমরা উপরে জেনেছি যে মানুষ যন্ত্রের সাহায্য ছাড়া অতিবিগুনী রশ্মি(Ultra-violet Ray) থেকে এর পরের এক্স-রে(X-rays), গামা-রে(Gamma Rays) ইত্যাদি তরঙ্গগুলো যেমন দেখতে পায় না তেমনি ইনফ্রেয়ারেড রশ্মি(Infrared Ray) থেকে এর পরের মাইক্রোও তরঙ্গ(Micro-Waves), রেডিও তরঙ্গ(Radio Waves) ইত্যাদি তরঙ্গ দৈর্ঘ্যগুলোও দেখতে পায় না। কিন্তু আধুনিক বিভিন্ন যন্ত্রের সহযোগিতায় মানুষ এসব তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের মাধ্যমে কিভাবে বস্তুজগত দেখা যায় সেটা অনুধাবনে সক্ষম হয়েছে। যদিও ধ্যানের মাধ্যমে দিব্য চক্ষুর ক্ষমতা অর্জনের বিষয়টি সর্বোত্তম পন্থা তথাপি সাধারণ্যে এটা সুকঠিন হওয়ায় সহজ পদ্ধতি যন্ত্রের সাহায্যে দিব্যচক্ষুর ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করতে পারে যা অনেকটা যন্ত্রের মাধ্যমে চর্ম চক্ষুর প্রতিষ্ঠাপন (transplant) করা মতোই। আধুনিক মানুষ যেমন শক্তিশালী টেলিস্কোপের(Powerful Telescope) সাহায্যে দূরবর্তী জিনিসকে দেখতে পারে কিংবা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের(Microscope) সাহায্যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব জগতের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করতে পারে। বর্তমানে হাজার হাজার মাইল কিংবা হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরবর্তী ঘটনার পর্যবেক্ষণ যেমন টেলিভিশন, কৃত্রিম উপগ্রহ, মহাকাশ যান ইত্যাদির সহযোগিতায় দেখা যায় সেটা বুদ্ধের সময়ে ছিল কেবল দিব্য চক্ষুলাভীদের একতিয়ারে। সেই সময়ে সম্ভবত ধ্যানই একমাত্র মাধ্যম ছিল চর্ম চক্ষুকে ছাড়িয়ে দিব্যচক্ষুর মাধ্যমে দর্শনের স্বাদ নিতে। বুদ্ধ তথাগত এটা বুঝতেন যে যদিও মানুষের দর্শন ক্ষমতা অনেক তথাপি সেটা চর্ম চক্ষুর সক্ষমতা দ্বারা সীমাবদ্ধ ছিল। বিদর্শন ধ্যানের দ্বারা লব্ধ বোধিজ্ঞানের মাধ্যমে বুদ্ধ বুঝেছিলেন দেখার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো এবং সেসব অতিক্রম করার একমাত্র পথ বিদর্শন ধ্যান। সমথ ধ্যান দ্বারা এই দিব্য চক্ষু লাভ করা যায়। উল্লেখ্য যে দিব্য চক্ষু লাভ হলেও মানুষ অবিদ্যা ও তৃষ্ণার শৃঙ্খলমুক্ত হয় না।
০৩। প্রজ্ঞা চক্ষু(Wisdom eye): প্রজ্ঞা চক্ষু সম্পর্কে কিছু বলার আগে আমাদের বৌদ্ধ দর্শনের একটা মৌলিক বিষয়ের সাথে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। সেটা হচ্ছে “শূণ্যতা”। বৌদ্ধ দর্শনের শূণ্যতা ধারণা নিয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রয়েছে। শূণ্যতা নিয়ে আমি অতি সংক্ষেপে কিছু ধারণা দিব এখানে। মহাজগতের সবকিছুই সতত পরিবর্তনশীল এবং প্রবাহমান। কোনকিছুই স্থির নয়। পরিবর্তনশীল ও প্রবাহমান সবকিছুই অনিত্য। যার নিত্যতা নেই তার অস্তিত্বও নেই। যার অস্তিত্ব নেই তাই শূণ্য। শূণ্যবাদ অনুযায়ী, জগতের বিভিন্ন বিষয়কে আমরা সত্য বলতে পারি না। কেননা সত্য অর্থ হচ্ছে নিরপেক্ষ। যেসব বস্তুকে আমরা জানি সে সব বস্তু কোন-না-কোন বস্তুর উপর নির্ভরশীল। জগতের বিভিন্ন বস্তুকে আমরা অসত্য বলতে পারি না, কেননা তা প্রত্যক্ষ হয়। যা অসত্য তা আকাশকুসুমের মতো কখনো প্রত্যক্ষ হয় না। জগতের বিষয়কে সত্য ও অসত্য এই উভয়াত্মক বলা যায় না, কেননা এরূপ বলা স্ববিরোধী। আবার জগতের বিষয় সত্যও নয় অসত্যও নয় এরূপ বলা যায় না; কেননা এরূপ বলা সম্পূর্ণ আত্মবিরোধী। ফলে বস্তুর স্বরূপ এ চারকোটি হতে মুক্ত হবার দরুন শূণ্য বলা হয়। যা তত্ত্ব তা সৎ নয়, অসৎ নয়, সদসৎ নয়, সদসদ্বিলক্ষণ নয়। ফলে এ চারি কোটিবিনির্মুক্ত তত্ত্বকে শূণ্য বলা হয়। অথাৎ: বস্তুর যথার্থ প্রকৃতি বুদ্ধি দিয়ে নির্ণয় করা যায় না। এজন্য বস্তুকে অনির্বচনীয় ও নিঃস্বভাব বলে দেখানো হয়। বস্তুর যথার্থ প্রকৃতির এই অনির্বচনীয়তাই শূণ্যতা। শূণ্য “অবাচ্য বা চতুষ্কোটি বিনির্মুক্ত”। অর্থাৎ শূণ্য অর্থ সৎ নয়, অসৎ নয়, সৎ ও অসৎ নয়, আবার সৎও নয় অসৎও নয়- এমনও নয়। তাই যদিও আমাদের মনে হয় বস্তু আছে অথচ যখন আমরা বস্তুর অস্তিত্বের যথার্থ তাৎপর্য নির্ণয় করতে চেষ্টা করি, তখন ব্যর্থ হই বা বস্তুর অস্তিত্ব বিনষ্ট হয়ে যায়। এই ব্যর্থটার জন্যই বস্তুকে শূণ্য বলা হয়। শূণ্যতা ধারণার এই ব্যাখ্যা দার্শনিক ব্যাখ্যা। এই দার্শনিক ব্যাখ্যাটি অনেকের কাছে বোধগম্য নাও হতে পারে। তাই আরও সহজ ভাষায় পদ্ধতিগতভাবে বললে তিনটি উপায়কে অবলম্বন করতে হয়। (ক) বিশ্লেষণমূলক ব্যবকলন পদ্ধতি(The analytical method of disintegration); (খ) বিশ্লেষণমূলক সমাকলন পদ্ধতি(The analytical method of integration); (গ) বিশ্লেষণমূলক মর্মভেদানাত্মক পদ্ধতি(The analytical method of penetration)
(ক) বিশ্লেষণমূলক ব্যবকলন পদ্ধতি(The analytical method of disintegration): এই পদ্ধতিতে কোন বস্তুকে(স্বরূপকে) বিশ্লেষণ দ্বারা তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয়। যেমন ধরুন একটি রেডিও। আমরা যদি রেডিওকে(এর স্বরূপকে) প্রতিটি অংশ ভাগ ভাগ করে খুঁজতে থাকি তখন পাব ট্রানজিস্টর, লাউড স্পীকার, চুম্বক, ফ্রেম ইত্যাদি। কিন্তু রেডিও বলতে কিছুই পাব না। তখন রেডিও তার অস্তিত্ব হারাবে। অনুরূপভাবে একজন মানুষকে যদি খুঁজতে থাকি তখন হাত, পা, চোখ, চামড়া, কান, নাক, পাকস্থলী, ফুসফুস, হৃদপিন্ড ইত্যাদি নামে বিভিন্ন অংশ পাব কিন্তু মানুষ বলতে কোন কিছুই পাব না। এভাবে বিশ্লেষণ দ্বারা খুজতে থাকলে মানুষ বলতে কোন কিছুর অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না। সুতরাং যাকে আমরা অস্তিত্বশীল বলছি তাকে আমরা কিছুতেই পাবো না যদি বিশ্লেষণ দ্বারা খুঁজতে থাকি। অতএব, কোনকিছুরই অস্তিত্ব বলতে কিছুই নেই। সবই সাপেক্ষ বিবৃতি মাত্র।
(খ) বিশ্লেষণমূলক সমাকলন পদ্ধতি(The analytical method of integration): যদিও আমরা মহাবিশ্বে অসংখ্যা উপাদান দেখি কিন্তু সবকিছুকে কিছু সুনির্দিষ্ট উপাদানে একীভূত করতে পারি। যেমন ধরুন সোনা। সোনা দিয়ে বিভিন্ন উপাদান তৈরি করা হলেও এবং প্রত্যেকটির বিভিন্ন ব্যবহারিক নাম থাকলেও সবকিছুর উপাদান শেষে সোনাই পাওয়া যায়। সোনা বলতে আমরা সোনার বারকে বুঝি। কিন্তু সোনা বারও সোনা দিয়ে তৈরি। কিন্তু সোনাও যেহেতু পরিবর্তনশীল, অনিত্য। যার কারণে তারও অস্তিত্ব নেই। বৌদ্ধ দর্শনে যদিও ব্যবহারিক অর্থে প্রত্যেকটি বস্তুকে(রূপ) কঠিন, তরল, বায়বীয় এবং তাপ(পৃথিবী ধাতু, অপ ধাতু, তেজ ধাতু ও বায়ু ধাতু) এই চারি উপাদানে ভাগ করা হয় তথাপি এই চারি উপাদানও পরিবর্তনশীল এবং শূণ্য। বুদ্ধ বলেছেন মহাবিশ্বের সবকিছুকেই একটি জায়গায় একীভূত করা যায় আর তা হচ্ছে শূণ্যতা। মজার ব্যাপার হচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞানও যতই অগ্রসর হয়েছে ততই এই শূণ্যতার ধারণায় উপনীত হয়েছে। যেমন- আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব আবিষ্কারের পূর্বে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের সবকিছুকে দুটি জায়গায় একীভূত করেছেন তাত্ত্বিকভাবে আর তা হচ্ছে বস্তু এবং শক্তি(matter and energy)। পরবর্তীতে আইনস্টাইন এই দুটি উপাদানকেও একীভূত করেছেন এবং গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেছেন যে বস্তুও আসলে এক ধরণের শক্তি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে শক্তির আসল প্রকৃতি কী? শক্তির কোন গঠনকাঠামো নেই। এটাকে বলা যায় নিরাকারাকৃতি (formless form)। আধুনিক বিশ্বব্রহ্মান্ধ তত্ত্বের(Cosmology) বিগ ব্যাং তত্ত্ব(Big Bang Theory) বলছে শূণ্য থেকেই মহাবিশ্বের উৎপত্তি। কিন্তু শক্তির মোট পরিমাণ তো অপরিবর্তনীয়। তাহলে শূন্য থেকে মহাবিশ্বের উৎপত্তি কি শক্তির নিত্যতা সূত্রের লঙ্ঘন নয়? সাদা চোখে মনে হতে পারে শূন্য থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মহাবিশ্ব তৈরি হওয়াটা শক্তির নিত্যতার লঙ্ঘন। আসলে কিন্তু তা নয়। স্ফীতিতত্ত্ব(Inflationary Theory) নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীরা গণনা করে দেখেছেন যে, মহাবিশ্বের মোট শক্তির পরমাণ সব সময়ই শূন্য থাকে। শক্তির যোগ ফল শূন্য হলে এই পৃথিবী সূর্য, চেয়ার, টেবিল সহ হাজারো রকমের পদার্থ তাহলে আসলো কোথা থেকে? বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মহাবিশ্বের দৃশ্যমান জড়পদার্থগুলো তৈরি হয়েছে আসলে ধনাত্মক শক্তি থেকে, আর অন্যদিকে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের রয়েছে ঋণাত্মক শক্তি। এই দুটো পরস্পরকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। তাই, মহাবিশ্বের শক্তির বিজগণিতীয় যোগফল হিসেব করলে সবসময় শূন্যই পাওয়া যায়।
(গ) বিশ্লেষণমূলক মর্মভেদনাত্মক পদ্ধতি(The analytical method of penetration): যদিও বুদ্ধ ধ্যানের মাধ্যমে এ পদ্ধতি রপ্ত ও অনুধাবন করার কথা বলেছেন তথাপি যেহেতু সকলের দ্বারা অত সহজে ধ্যান পদ্ধতি অনুসরণ করা সম্ভব নয় তাই আমরা আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত বোধগম্য পদ্ধতির দ্বারা এটা বুঝার চেষ্টা করব। আমরা উপরে তড়িৎ চুম্বকীয় বর্ণালীর(electromagnetic spectrum) কথা আলোচনা করেছিলাম। সেখানে আমরা দেখেছি যে মহাবিশ্বের অতি ক্ষুদ্রতম অংশ কেবল আমাদের খোলা চোখে(Naked Eye) দৃশ্যমান। কিন্তু আমরা যন্ত্রের সাহায্যে যেমন- ইনফ্রারেড ডিভাইস, অণুবীক্ষণ যন্ত্র, এক্স-রে বা টেলিস্কোপ এর মাধ্যমে খালি চোখে দৃশ্যমান জগতের বাইরের জগত সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারি। বিষয়টি নিচের ছবির সাহায্যে সহজে বুঝানো যাবে।
তড়িৎ চুম্বকীয় বিভিন্ন তরঙ্গের মাধ্যমে এভাবে একই বিষয়কে দেখা যায়
উপরের ছবিতে ১ থেকে ৫ পর্যন্ত একই ব্যক্তির বিভিন্ন অবভাসিত(Appearance) রূপ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের যন্ত্র দ্বারা একই ব্যক্তিকে বিভিন্নভাবে সনাক্ত করা(Detected by different instruments at different wave length) যায় এটিই ছবিতে দেখানো হয়েছে। যেমন- ১ নং ছবিতে লাল, হলুদ এবং সবুজ রঙের যে অবভাসিত রূপ সেটা দেখা যায় ইনফ্রারেড ডিভাইসের মাধ্যমে। প্রাণী জগতে সাপ এভাবে অন্যান্য প্রাণীদের দেখে থাকেন। ২ নং ছবিতে আমরা খোলা চোখে যা দেখি সেটা। ৩নং ছবিতে রঞ্জনরশ্মির যন্ত্র(X-ray Device) দিয়ে একই ব্যক্তিকে মাংস, চামড়া ইত্যাদি বাদে কেবলমাত্র হাড়ের কঙ্কাল কাঠামো দেখা যাচ্ছে। ৪ নং ছবিতে অনুবীক্ষণ যন্ত্র(Microscope) দ্বারা একই ব্যক্তিকে আণবিক কাঠামো(molecular structure) দেখা যাচ্ছে। একেবারেই ডানে ৫ নং জায়গায় কোন ছবি না দেখিয়ে খালি দেখাচ্ছে। এটাকে বলা যায় নিরাকারাকৃতি(formless form)। অর্থাৎ দৃশ্যমান সকল পদার্থই(Matter) শক্তিতে রূপান্তরিত অবস্থার এক অবভাসিত রূপ এটি যা নিরাকার। এই নিরাকার শক্তির দুই দিক। পজিটিভ এবং নেগেটিভ। দুই শক্তির মিলনের ফল শূণ্যতা। শূণ্য থেকে আবার শক্তি এবং শক্তি(পজিটিভ) থেকে যাবতীয় সকল পদার্থ- আপনি, আমি, উদ্ভিদ, প্রাণীকূল, জড়, অজড় সব। এই শূণ্যতায় কিছুই পার্থক্য থাকে না। এই যে শূণ্যতার কথা বলা হল যা আধুনিক বিজ্ঞানও এই সিদ্ধান্তে পৌছেছে এখন এটি বুদ্ধ তথাগত সেই আড়াই হাজার বছর পূর্বে দেশনা করে গিয়েছিলেন অনিত্যবাদ তথা শূণ্যবাদ বলে। তবে আধুনিক বিজ্ঞানের জ্ঞান দ্বারা জ্ঞাত শূণ্যতা আর ধ্যানের মাধ্যমে উপলব্ধিজাত শূণ্যতা একই নয়। বিজ্ঞানের জ্ঞানে জানা শূণ্যতাকে ধ্যানের মাধ্যমে অর্জিত শূণ্যতা জ্ঞানকে বুঝানোর জন্য উপমাস্বরূপ ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র। বিজ্ঞানের শূণ্যতা থেকে ধ্যানের মাধ্যমে অর্জিত শূণ্যতাবোধ অনেক গভীর এবং স্বয়ং প্রত্যক্ষ সাপেক্ষ, যুক্তি ও উপমা সাপেক্ষ নয়। বুদ্ধ ধ্যানের মাধ্যমে এই প্রজ্ঞা চক্ষু অর্জন করেছিলেন। প্রজ্ঞা চক্ষুর দৃষ্টিতে এ শূণ্যতা আরও অনেক গভীর যা আমরা আধুনিক বিজ্ঞানের সাহায্যে এখন স্বল্প পরিসরে বুঝতে পারছি। এই শূণ্যতাকে প্রজ্ঞা বা বোধি বলা হয়। আর এই প্রজ্ঞাচক্ষু লাভী ব্যক্তিগণকে অর্হৎ বলা হয়।
০৪। ধর্ম চক্ষু(Dharma eye): এই ধর্ম চক্ষু হচ্ছে এমন পর্যায় যখন অর্হৎগণ(মহাযান দর্শন মতে বোধিসত্বগণ) মুক্তির সন্ধানে প্রজ্ঞা চক্ষু লাভ করার পর সেখানে থেমে না থেকে আরও সাধনা করেন এবং এই চক্ষুতে উন্নীত হন। তখন তাঁর/তাঁদের উপলব্ধি হয় যে, বিভিন্নভাবে যা কিছু প্রত্যক্ষ হয় সেসব মনোময় প্রকাশ মাত্র(Manifestation)। চর্ম চক্ষুর দ্বারা সাধারণভাবে প্রত্যক্ষ করা মানুষ যেমন মনে করে যে তার দৃশ্যমান জগতই সবকিছু ঠিক, যথার্থ এবং বাস্তবিক তেমনি দিব্য চক্ষুর অধিকারী অনেক ব্যক্তিও মনে করে তার কাছে অবভাসিত জগতই সব এমনকি এভাবে একসময় প্রজ্ঞা চক্ষুর অধিকারী অনেককেই মনে করে থাকেন যে শূণ্যতায় সবকিছু। এভাবে এই ত্রিস্তরের ব্যক্তিপুদগল মনে করেন স্ব স্ব জগতই সবকিছু এবং স্ব স্ব দৃশ্যমান জগতের কাছে অনুরাগ উৎপন্ন হয় তাদের। কিন্তু ধর্ম চক্ষুর অধিকারীগণ মনে করেন যে যদিও দৃশ্যমান সবকিছুই মনোময় প্রকাশ মাত্র এবং সেসবের স্বতন্ত্রতা নেই বরং পুদগল সাপেক্ষে সেসব আন্তবাস্তবিক অবভাসিত প্রপঞ্চ মাত্র। তখন এই বোধ থেকে অবধারিতভাবে নিরপেক্ষ(unconditional), নির্ভেদজ্ঞানসম্পন্ন সার্বজনীন মৈত্রী,করুণার উদয় হয়। মহাযান বৌদ্ধ দর্শনের মতে এই অবস্থায় বোধিসত্বগণ জগতের বিভিন্ন লোকভূমির অন্যান্য সত্ত্বগণের চক্ষু পদ্মপুষ্পের ন্যায় তাদের চক্ষুও প্রষ্ফুতিত করে মুক্ত করার তাগিদবোধ করেন এবং সে অনুযায়ী তাদের মুক্তির জন্য কাজ করেন।
০৫। বুদ্ধ চক্ষু(Buddha eye): এতক্ষণ ধরে পঞ্চচক্ষুর প্রথম যে চার প্রকার চক্ষুর দ্বারা প্রত্যক্ষকৃত জগত সম্পর্কে বর্ণনা করা হল সেসব জগতের উপমার ভিত্তিতে পরম বুদ্ধ চক্ষুর দ্বারা প্রত্যক্ষকৃত জগতকে বর্ণনা প্রায় অসম্ভব বলা যায়। তথাপি কিছুটা ধারণা লাভ করার জন্য আমরা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতে পারি বৌদ্ধ শাস্ত্রীয় বিভিন্ন উপমা দ্বারা। উপরে চারি প্রকার চক্ষুর আলোচনায় আমরা দেখেছি সেখানে প্রত্যক্ষকারী(Subject) ও প্রত্যক্ষকৃত বিষয়(Object) বর্তমান। যেমন- চর্ম চক্ষুর ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষকারী হচ্ছে মানুষ আর প্রত্যক্ষকৃত বিষয় হচ্ছে জগত ও জগতের বিভিন্ন বস্তু বা প্রপঞ্চ(Phenomenon); দিব্য চক্ষুর ক্ষেত্রে দিব্যসত্ত্ব এবং তার বিপরীতে বিশাল জগত; প্রজ্ঞা চক্ষুর ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষকারী হচ্ছে অর্হৎ এবং প্রত্যক্ষকৃত বিষয় হচ্ছে বিশ্বব্রহ্মান্ধের শূণ্যতা(Emptiness); আর ধর্ম চক্ষুর ক্ষেত্রে বোধিসত্ব হচ্ছে বিষয় প্রত্যক্ষকারী(Subject) এবং বিভিন্ন লোকভূমি তথা জগতের সমন্বয়ে গঠিত বিশ্বব্রহ্মান্ধ(Object)। কিন্তু বুদ্ধ চক্ষুর ক্ষেত্রে এটা বলা ঠিক হবে না যে বুদ্ধ হচ্ছেন প্রত্যক্ষকারী আর মহাজাগতিক বিষয়সমূহ হচ্ছে প্রত্যক্ষকৃত বিষয়। কারণ এক্ষেত্রে বুদ্ধ আর বিশ্বব্রহ্মান্ধের মধ্যে স্বাতন্ত্র্যসূচক (Distinction) আর কোন রেখা থাকে না। বুদ্ধই বিশ্বব্রহ্মান্ধ আর বিশ্বব্রহ্মান্ধই বুদ্ধ(Buddha is universe and universe is Buddha)। একই অর্থে এখানে বুদ্ধ চক্ষুর অধিকারী বুদ্ধ- এ কথাও বলাটা ঠিক হয় না কারণ বুদ্ধ ও বুদ্ধ চক্ষুর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তিনিই বুদ্ধ, তিনিই বুদ্ধ চক্ষু এবং তিনিই বিশ্বব্রহ্মান্ধ। সংক্ষেপে বলতে গেলে এক্ষেত্রে দ্বৈত (Duality) ধারণা গঠন কোনভাবেই প্রাসঙ্গিত নয়। দ্বিতীয়ত, বুদ্ধ চক্ষু সম্পর্কে যে কথাটি বলা যায় সেটি হচ্ছে প্রকৃতির অনন্ত অসীমতা(Infinite infinity)। আমি অনন্ত অসীমতা বলতে কি বোঝাতে চেয়েছি ? যদিও আমরা বলে থাকি যে মানুষের ভাবনায় বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অসীম, কিন্তু এটা অনেকটা সমুদ্রের বিশাল জলরাশির কাছে বুদবুদের(Bubble) মত যখন বুদ্ধর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডিক অভিজ্ঞতার সাথে তুলনা করা হয় ! হ্যা , ব্যাপারটি অসাধারন । আপনি গাণিতিকভাবে তা ভেবে দেখুন । আপনি জানেন প্রথম মাত্রা মানে হল একটি রেখা(Line) । দ্বিতীয় মাত্রা হল একটি সমতল(Plane)। আর তৃতীয় মাত্রা বলতে ত্রিমাত্রিক স্থানকে(three-dimensional space) বুঝায় । এই সকল আকৃতি ইতোমধ্যে আকৃতিতে অসীম হতে পারে ! এবার চতুর্থ মাত্রার কথা ভাবুন , এরপর পঞ্চম মাত্রা , এভাবে n তম মাত্রা পর্যন্ত। যদি আপনি n তম মাত্রা কি প্রকাশ করে তা ব্যাখ্যা করতে পারেন , তবে বুদ্ধ চক্ষুর দ্বারা প্রত্যক্ষকৃত সৃষ্টিতত্ত্ব/বিশ্বতত্ত্ব সম্পর্কে কিছু জ্ঞান পাবেনঃ অনন্ত অসীম ! তৃতীয়ত বুদ্ধ চক্ষু সম্পর্কে যে কথাটি বলা যায় তা হল ক্ষণিকত্ব ও স্বতোবৃত্ততা(Instantaneity and Spontaneity)। বাল্যকাল, কৈশোর, যৌবন, বৃদ্ধকাল ইত্যাদিকে সাধারণভাবে আমরা সময় মাত্রায় বুঝে থাকি। আমাদের বোধের বাইরে যে, বুদ্ধ চক্ষুর ক্ষেত্রে এধরণের সময় মাত্রা অনুপস্থিত। হাজার লক্ষ কোটি বছর আর এক ন্যানো সেকেন্ড এর মাঝে কোন ব্যবধান এতে নেই। আমাদের পৃথিবী থেকে লক্ষ কোটি আলোকবর্ষ দূরত্বের যে মহাবিশ্বের কথা আমরা চিন্তা করি সেসব অতিক্রম করা বুদ্ধ চক্ষুর ক্ষেত্রে নিছক একটা ক্ষণ(one instant) মাত্র। চতুর্থত বা শেষতক যে কথাটি বলা যায় সেটি হচ্ছে সামগ্রিকতা এবং সমস্ত-অন্তর্নিহিততা(totality and all-inclusiveness)। এটা বুঝার জন্য আমরা অন্ধকূপ বা কৃষ্ণগহব্বরে(Black hole) উপমা ব্যবহার করতে পারি। কৃষ্ণগহব্বরের অসীম ঘনত্ব এবং আকর্ষণ বল যেমন তার ঘটনা দিগন্তের(Event horizon) মধ্যে থাকা সবকিছুকে শোষণ করে এর এককত্বের (Singularity) দিকে নিয়ে নেয় তেমনি বুদ্ধ চক্ষু সবকিছুকে তার দৃষ্টির সীমায় এনে দেখার ক্ষমতা রাখে। বুদ্ধ চক্ষুর অনন্ত অসীমত্বকে আমরা এভাবেই অনুমান করে নিতে পারি।
আমার আলোচনাটি শুরু হয়েছিল “এসো দেখ উপনীত হও(এহিপস্সিকো ওপনাযিকো” দিয়ে। আমরা এতক্ষণ আলোচনায় দেখতে পেলাম দেখার মাঝে রয়েছে অত্যন্ত সুগভীর ভিন্নটা। আমি আমার পূর্বের এক লেখায় কচ্ছপ আর মাছের উপমার মাধ্যমে আমাদের ব্যবহারিক জ্ঞান, যুক্তি তথা দৃষ্টির সীমাবদ্ধতার কথা বলেছিলাম। সেখানে বলেছিলাম, “এটা বুঝার জন্য অবিদ্যা ও তৃষ্ণাকে আগে সমূলে ধ্বংস করে বৃত্তকে ভাঙতে হয়। বৃত্ত ভাঙতে হলে বিদর্শন ভাবনার দ্বারা বিশেষ দর্শন জ্ঞানের মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে অগ্রসর হতে হয়। এই মার্গে গমন আমাদের লোকীয় দর্শনের আরোহ অবরোহ পথের মত যুক্তি বা তর্ক সাপেক্ষ নয় বোধ বা বোধি সাপেক্ষ।” হ্যাঁ, আবারও এখানে সেই একই কথাই বলব, বৌদ্ধ দর্শন মতে প্রকৃত সম্যক দৃষ্টি লাভ করার জন্য বিদর্শন ধ্যানের বিকল্প নেই। একমাত্র বিদর্শন ধ্যানের মাধ্যমেই অবিদ্যা ও তৃষ্ণার শৃঙ্খল ভেঙ্গে বোধের উন্নয়ন ঘটিয়ে বোধিজ্ঞান অর্জনের দ্বারা পরম বুদ্ধ চক্ষু লাভ হয় এবং প্রকৃতই স্বরূপ দর্শন কেবলমাত্র তখনই সম্ভব, তার আগে নয়।
ধন্যবাদ অনেক মূল্যবান সময় ব্যয় করে কষ্ট স্বীকারপূর্বক ধর্য্য ধরে এই দীর্ঘ লেখাটি পড়ার জন্য।
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।
বিস্তারিত জানতে তথ্যসূত্র:
০১। The Five Eyes
০৯। Śūnyatā
১৩। Changma Chikko Note থেকে
Please follow and like us:

By pbsb

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *