অর্থাৎ শৈক্ষ্য(শিক্ষাব্রতী) এই যমলোক ও দেবলোকসহ পৃথিবীকে জয় করবে। সুনিপুণ মালাকারের ন্যায় শৈক্ষ্য সুদেশিত ধর্মপদ সংগ্রহ করবে।
বুদ্ধের নৈর্বাণিক বা লোকোত্তর শিক্ষায় আটটি স্তর রয়েছে, যেমন- স্রোতাপত্তি মার্গ, স্রোতাপত্তি ফল, সকৃদাগামী মার্গ, সকৃদাগামী ফল, অনাগামী মার্গ, অনাগামী ফল, অরহত মার্গ, অরহত্ত ফল। এই আটটি স্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং কাঙ্ক্ষিত স্তর হল অরহত্ত ফল যার প্রাপ্তীতে শিক্ষা সমাপ্ত হয়। যিনি অরহত্ত ফলে উত্তীর্ণ হন তাঁর আর শিক্ষা গ্রহণ করতে হয় না বলে বুদ্ধ তাঁকে অসেখ বা অশৈক্ষ্য নামে অভিহিত করেন। অসেখ অর্থ হল শিক্ষা সমাপ্তকারী, পূর্ণ শিক্ষিত। বাকী সাতটি স্তর সেখ বা শৈক্ষ্য বা চলমান শিক্ষার স্তর, শিক্ষিত হওয়ার জন্য প্রচেষ্টায় আছে এমন। উপরের গাথাটির উপদেশ বুদ্ধের এই নৈর্বাণিক শিক্ষাব্রতীদের নির্দেশ করেছে। নৈর্বাণিক শিক্ষার প্রথম স্তর যদি স্রোতাপত্তি মার্গ হয় তাহলে আমরা এখনও ঐ স্তরে পৌঁছুতে পারিনি। সে হিসেবে আমরা এখনও শিশু শ্রেণিতে পড়ছি। তাই বলা যায় উক্ত গাথাটি তথাগত বুদ্ধের লোকোত্তর শিক্ষা সম্পর্কিত দেশনা হলেও তা লৌকিক শিক্ষার নিরিখেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূলত বুদ্ধের প্রচারিত দর্শন লৌকিক লোকোত্তর উভয় দিক নির্দেশ করে। বলা যায়, যখন যেখানে যেমন। যার যে অবস্থানে থেকে প্রয়োগ করে জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলা যায়। যেহেতু আমরা এখনও লৌকিক স্তরের বাসিন্দা তাই এ নিরিখে আমাদের ভাবতে হবে, এরূপ প্রায়োগিক ধারা বা বাস্তব সম্মত আচরণের মাধ্যমে আমাদের জীবন সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধময় হয়ে উঠবে।
উপরোক্ত বাণীটির আলোকে আমরা বলতে পারি শিক্ষিত, দক্ষ ও বুদ্ধিমানরাই বিশ্বে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং মানুষের উন্নত জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্যক উপায় উদ্ভাবন করতে সক্ষম।
আমরা জানি শিক্ষা মানুষকে মনুষ্যত্ব দান করে। একজন শিক্ষিত ব্যক্তি তার মা-বাবাসহ পরিবারের যেমন পরম আকাঙ্ক্ষেয় তেমনই সমাজ, দেশ তথা সমগ্র পৃথিবীরও অমূল্য সম্পদ। তাই শিক্ষা গ্রহণ করা, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া আমাদের কর্তব্য হওয়া উচিত। এখন শিক্ষিত কিভাবে হওয়া যায়? বুদ্ধের উক্তিতে তার উত্তর রয়েছে। তিনি বলেন –
বাহুসচ্চঞ্চ সিপ্পঞ্চ বিনযো চ সুসিক্খিতো
সুভাসিতা চ যা বাচা এতং মঙ্গলমুত্তমং।
(মঙ্গলসুত্ত, সুত্তনিপাত ও খুদ্দকপাঠ।)
অর্থাৎ বহু শাস্ত্রে অভিজ্ঞ হওয়া, শিল্প বিদ্যায় পারদর্শী হওয়া, বিনয়ে সুশিক্ষিত হওয়া এবং সুভাষিত বাক্য ভাষণ করা উত্তম মঙ্গল।
একজন দক্ষ, সুদক্ষ, সুশিক্ষিত ব্যক্তি কখনও দেশের বোঝা নয়। এমনকি সে কখনও বেকার থাকে না। নিজ অভিজ্ঞতার গুণে সে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করে। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকালে করুণ দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠে। আজ এখানে জিপিএ ৫, গোল্ডেন জিপিএ-এর সস্তা প্রতিযোগিতা চলছে। কিন্তু যে শিক্ষা শুধু স্কুল কলেজে যেয়ে সিলেবাসের বই পড়ে পরীক্ষা নামক সিস্টেমের মাধ্যমে পঠিত বিষয়গুলো উগরে দিয়ে একটি সনদ লাভ করাতে সীমাবদ্ধ, সে শিক্ষা প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না। আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে প্রচলিত সাধারণ শিক্ষা খুবই একটা ফলপ্রসূ হতে পারছে না। শুধুমাত্র একমুখি তথা গ্রন্থগত শিক্ষা মানুষকে তার লক্ষ্য পূরণের দিকে ধাবিত করতে পারে না। তাই সাধারণ ডিগ্রি লাভের পাশাপাশি প্রয়োজন জ্ঞানযুক্ত কর্মমুখী তথা বৃত্তিমূলক শিক্ষা অর্জনের প্রচেষ্টা। আজ আমাদের দেশে শিক্ষিত ব্যক্তির সংখ্যা অনেক কিন্তু দক্ষ, সুশিক্ষিত ব্যক্তির সংখ্যা কম। আর আমাদের এখানকার মানুষদের একটি সংস্কৃতি হয়েছে যে লেখাপড়া করে একটি সরকারি চাকরি করা। এ ছাড়া আর অন্য কোন চাওয়া নেই। মানুষদের এমন চাকরিমুখি হওয়ার কারণে চাকরির বাজার চরম দুর্নীতিগ্রস্ত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে হলেও চাকরি একটা চা-ই চা-ই। তাই চাকরি প্রাপ্তীর এমন অসম প্রতিযোগিতার কারণে চাকরি দাতারা অসদুপায় অবলম্বন করতে উৎসাহিত হচ্ছে। এ বিষয়ে ড. ইউনূসের একটি মন্তব্য প্রনিধাণ যোগ্য, তিনি বলেন- ‘শিক্ষার উচিত তাকে উদ্যোক্তা বা চাকরি সৃষ্টিকারী হতে প্রস্তুত করা, চাকরি খুঁজতে নয়। …আমরা যদি তরুণদের চাকরি সৃষ্টিকারী হিসেবে গড়ে তুলতাম, তাহলে বেকারত্ব বলে কিছু থাকত না’(bani.com.bd)। সুতরাং চাকরির আশায় লেখা পড়া না করে স্বমর্যাদায়, স্বমহিমায় দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যে পড়াশোনা করা উচিত। এ ক্ষেত্রে একমাত্র বৃত্তিমূলক শিক্ষায় সে উদ্দেশ্য পূরণের পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা দিতে পারে। এ শিক্ষাই দিতে পারে মানুষকে স্বচ্ছল ও আত্ম মর্যাদাসম্পন্ন উন্নত জীবন। বৃত্তিমূলক শিক্ষাকেই বুদ্ধ প্রশংসা করেছেন। বিভিন্ন শাস্ত্রের পঠন-পাঠন, নানাবিধ শিল্প শিক্ষা করণ ও তাতে পারদর্শীতা লাভ মানুষের জীবনকে কঠিনতা থেকে উত্তরণ ঘটাতে সহযোগিতা করে। এর জন্যে আমাদের ছোট বড় বাছ বিচার না করে যে কোন শিল্পকে আয়ত্ব করতে হবে। ‘জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ’ আমাদের অধিগত করতে হবে। সময় সাপেক্ষে যখন যেটার সুযোগ ঘটে সেটাকেই কাজে লাগাতে হবে। লোকনীতি’তে উল্লেখ আছে- ‘শিল্প ও বিদ্যা ক্ষুদ্র হলেও কখনও অবহেলা করবে না। যে কোন বিষয়ে পরিপূর্ণ দক্ষতা লাভ হলে জীবনে সুখ লাভ করা যায়।
বিদ্যা ক্ষুদ্র হলেও কখনও অবহেলা করবে না। যা শেখা হয়েছে তা যেন অন্তরে গ্রথিত থাকে। উই পোকারা যেমন ছোট ছোট মাটির দানা একত্রিত করে বড় ঢিবি তৈরি করে, বিন্দু বিন্দু জলে যেমন কলসী পূর্ণ হয় তদ্রুপ একটু একটু জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে জ্ঞানী হওয়া যায়।
এ জগতে শিল্প হল শ্রেষ্ঠ ধন, তা চোরে হরণ করতে পারে না। ইহলোকে শিল্প বন্ধু, পরলোকেও সুখ প্রদায়ী।’
এ বিষয়ে পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন তাঁর ‘ভবঘুরে শাস্ত্র’ গ্রন্থের এক জায়গায় বলেছেন ‘অন্তত কোন কিছু জানা না থাকলেও ক্ষৌরকর্ম বা নাপিত বিদ্যা হলেও আয়ত্ব থাকা দরকার। বিদেশে এটি একটি ভালো কর্মসংস্থান। ক্ষৌরকর্ম কিন্তু সস্তা মজুরির বৃত্তি নয়। ইউরোপে যে কোন দেশের একজন ক্ষৌরকর্মী একজন অধ্যাপকের সমান রোজগার করতে পারেন।’ শুধু বিদেশে কেন আমাদের দেশেও এর চাহিদা প্রচুর। কি গ্রামে, কি শহরে সব জায়গায় সব বয়সী পুরুষদের নিয়মিত চুল, দাড়ি কামাতে হয়। তাই এ বিদ্যায় পারদর্শী যে কেউ স্বচ্ছল কর্মসংস্থান করতে পারে। এ ছাড়াও কৃষক, খামারী, কাঠমিস্ত্রি, কামার, স্যাকরা, দর্জি, ধোপা, কুমোর, রংমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি, ইলেক্ট্রিশিয়ান, কম্পিউটার-মোবাইল-টিভি-ইঞ্জিন মেকানিক, প্রিন্টিং কাজ, কম্পিউটার অফিস অ্যাপ্লিকেশন, প্রাথমিক গ্রাফিক্স ডিজাইন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হকার, দিনমজুর, কুলি, বেত শিল্প, তাঁত শিল্প, হস্ত শিল্প, চিত্র শিল্প, সংগীত শিল্প, নৃত্য, বাদ্য এ সকল বৃত্তিগুলো ছোট হলেও অবহেলার চোখে দেখার কোন জো নেই। কেউ যদি এ সবের কোন একটিতে পরিপক্ক হয় তাহলে তার আর কাজহীন হয়ে বেকার থাকার ভয় থাকে না। এতদ্ব্যতিত যদি উচ্চ বৃত্তিয় শিক্ষার সুযোগ পাওয়া যায় তবে তা ভালো, যেমন- কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, চিকিৎসক, অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার, সফ্টওয়ার ইঞ্জিনিয়ার, আইটি বিশেষজ্ঞ, গ্রাফিক্স ডিজাইনার, ওয়েব ডিজাইনার, ফ্যাশন ডিজাইনার, কৃষিবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজ্ঞ, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, পদার্থবিদ, রসায়নবিদ, পরিবেশবিদ, রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক, উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক প্রভৃতি।
শিক্ষার্থীদের অবশ্যই পড়ুয়া হতে হবে। বর্তমানে শিল্পগুলো প্রায়ই প্রযুক্তি নির্ভর হয়েছে, তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের গুরুত্ব অগ্রে দিতে হবে। স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইয়ের বাইরে তারা বিভিন্ন সত্য বিষয় নিয়ে পড়বে; সাহিত্য, ধর্ম, দর্শন, কলা, অর্থনীতি, রাজনীতি ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণামূলক বই। এছাড়াও বড় বড় লেখক, সফল ও মহান ব্যক্তিদের জীবনী, বিভিন্ন অনুপ্রেরণাদায়ী লেখা পড়তে হবে। বৌদ্ধ ছাত্র-ছাত্রী হিসেবে বুদ্ধের দর্শন পড়া অবশ্যই প্রাধান্য দিতে হবে।
বুদ্ধের দর্শনে অন্যতম প্রধান অংশ কর্মবাদ। কর্মই মানুষের স্বকীয়তা, কর্ম উত্তরাধিকার, কর্ম বন্ধু, কর্ম আশ্রয়, আমাদের বর্তমান কর্মই পরবর্তী পর্যায়ে অধিষ্ঠিত করে, কি ভালো কি মন্দ যে কর্ম করা হয় সে কর্মের ফল অবশ্যই ভোগ করতে হয়। এই কর্মমুখিতার কারণে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জাপান আজ বিশ্বের অন্যতম একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। চীন, কোরিয়া, ভিয়েতনাম প্রভৃতি বৌদ্ধ প্রধান দেশও বুদ্ধের কর্মবাদকে অনুসরণ করে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। তাছাড়া পশ্চিমা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোও এর উদাহরণ। এ সকল দেশের মানুষেরা কোন কাজকে ছোট মনে করে না। তাদের অন্তর ধ্যানে বিরাজ করে শুধু কাজ আর কাজ। যে কোন কাজকেই তারা ভালোবাসে। তারা সময়কে অবহেলা করে না। এটুকুন সময়ও তারা কাজে ব্যয় করে। তাদের স্কুলগুলোতে থিওরিক্যাল বা গ্রন্থমুখি শিক্ষার চাইতে প্র্যাক্টিক্যাল বা প্রায়োগিক শিক্ষা বেশি প্রদান করা হয়।
সকল শিক্ষার শ্রেষ্ঠ শিক্ষা হল বিনয় বা নৈতিকতা। নৈতিক শিক্ষাই প্রকৃত মনুষ্যত্ব বিকাশ করতে সক্ষম। নীতিহীন শিক্ষা প্রাণহীন দেহের ন্যায়। তাই প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত নিজেকে নৈতিক শিক্ষায় সমৃদ্ধ করা। আজ আমরা সামনের দিকে তাকালে দেখতে পাই, সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্র অনিয়ম, অসামঞ্জস্যে ভরপুর। আর এসবের মূলে যাদের দায়ী করা যায় তারা সকলেই উচ্চ শিক্ষিত। তারা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ থেকে পাস করা বড় বড় ডিগ্রিধারী। তারা আবার নীতি নির্ধারক, বুঝদার, বুদ্ধিজীবি, সমাজ পরিচালনার দায়িত্ব তাদের উপর ন্যস্ত। তাদের কথায়, নির্দেশে সাধারণ মানুষদের উঠা বসা করতে হয়। শুধু এখানেই শেষ নয়, এসব অনিয়মের সংস্কৃতি অতিসাধারণদের মননেও জায়গা করে নিয়েছে। বলতে গেলে উপর থেকে নীচ সবখানে এখন অনিয়মে ভরা। উচ্চ শিক্ষা নিতে গেলে ঘুষ, সরকারি চাকরি পেতে হলে ঘুষ, নাগরিক হিসেবে কোন কিছু নির্ঝঞ্ঝাট সুবিধা ভোগ করতে হলে ঘুষ দিতে হয়। তেমনি নানা অপকর্ম থেকে বাঁচার জন্যও ঘুষ দিলেই সব মাফ। এমন দুর্নীতিগ্রস্ত সিস্টেমের কারণে খাদ্য, ওষুধসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির বড় বড় উৎপাদন কারখানায় ভেজাল খাদ্য-ওষুধ ও দ্রব্যাদি তৈরি হচ্ছে। সেই সাথে মাঝারি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও তাদের অধিক মুনাফা লাভের জন্য ভেজাল মিশ্রিত পণ্য বিপণন ও সরবরাহ করছে। আর ঐসব ভেজাল খাদ্য-পণ্যের ভোক্তা হল বিশাল সংখ্যার সাধারণ মানুষেরা। এতে করে খাদ্য, স্বাস্থ্যসহ জানমালের চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে মানুষজন। বলতে গেলে এক দুর্নীতির হাতকড়ায় বন্দি আজ গোটা সমাজ। সম্প্রতি ‘jobsnow24.com’ নামক ওয়েব পোর্টালে দুর্নীতিগ্রস্থ সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে ‘সৎ থাকার কোন লজিক আমি দেখিনি’ শিরোনামে জনৈক ট্রাফিক সার্জেন্টের একটি লেখা ছাপান হয়েছে। ঐ লেখায় তিনি তাঁর অসৎ হওয়ার কারণ সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের পরিবেশকে দায়ী করেছেন। কারণ তিনি দেখেছেন যে সমাজে দুর্নীতিগ্রস্তরাই বেশি সম্মান পাচ্ছে। তাদের কথায়, নির্দেশে সমগ্র সমাজ পরিচালিত হচ্ছে। তাই উনি বলতে চান- এই দেশে সৎ থাকার কোন যুক্তি নেই।
কিন্তু এভাবেতো সমাজ চলতে পারে না। আমাদের অবশ্যই সৎ হওয়া উচিত। অন্য কেউ অসৎ হচ্ছে বলে আমিও অসৎ হব তা কেমনে হয়? আমাদের সৎ-এর পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে, নৈতিকার পক্ষে থাকতে হবে। আমাদের যদি নৈতিকতার চর্যা না থাকে তাহলে মানুষ হিসেবে লজ্জা পেতে হবে। প্রতিনিয়ত অনিয়মের প্রশ্রয় দিতে গিয়ে এক সময় এ সমাজ থেকে মানবিকতা পলায়ন করে পাশবিকতা স্থান করে নেবে। তখন আর নৈতিকতাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই আমাদের উচিত নৈতিকতার পক্ষে স্লোগান ধরা, প্রচারণা চালানো, মানুষকে নৈতিকতায় উদ্বুব্ধ করা। কারণ মানুষ হিসেবে আমাদের নানাবিধ নৈতিক কুশল কর্মে আত্মনিয়োগের কথা তথাগত বুদ্ধ বলেছেন। তিনি বলেন-
যথাপি পুপ্ফরাসিম্হা কযিরা মালগুণে বহূ
এবং জাতেন মচ্চেন কতব্বং কুসলং বহুং। ধম্মপদ-৫৩
অর্থাৎ যেমন পুষ্পরাশি হতে নানাবিধ মালা তৈরি হয়, তেমন মনুষ্য জন্মলাভীদের নানাবিধ কুশল কর্মে রত থাকা উচিত।
এখন কুশল কর্ম কারা করে? যারা নৈতিকতায় বিশ্বাসী, বিনয়ে সুশিক্ষিত তারাই কুশল কর্ম করে। যারা নীতিভ্রষ্ট তাদের অবস্থান কুশল কর্ম থেকে বহুদূরে। ত্রিপিটকে দশ প্রকার কুশলকর্মের কথা উল্লেখ আছে যেমন- দান, শীল, ভাবনা, সেবা, সম্মান, পুণ্যদান, পুণ্য অনুমোদন, ধর্ম দেশনা, ধর্ম শ্রবন, দৃষ্টিঋজু কর্ম। এগুলোর সংক্ষিপ্তাকারে ব্যাখা দেওয়ার চেষ্টা করা হল-
দান : দানের প্রচলিত অর্থ ত্যাগ, কিন্তু সব দান ত্যাগের পর্যায়ে পড়ে না। এ জন্য দান বলতে সাহায্য, সহযোগিতা, উপকার সাধনকে বোঝায়। সেটা গিভ এ্যান্ড টেক বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট যেমন হতে পারে তেমনি নিঃস্বার্থভাবেও হতে পারে। দান হল প্রাথমিক স্তর। কিন্তু ত্যাগ জিনিষটা নিঃস্বার্থ। এটি বিশাল এবং সুউচ্চ। বুদ্ধ এটিকে ‘চাগ’ বলেছেন, যা একজন আর্য মানবের সপ্ত গুণাবলি বা রত্নের অন্যতম একটি। সাতটি গুণ হল- শ্রদ্ধা, শীল, শ্রুতি, ত্যাগ, প্রজ্ঞা, পাপের প্রতি লজ্জা ও পাপের প্রতি ভয়। এগুলোকে সপ্ত আর্যধন বলা হয়। একজন দাতা যখন নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগস্বীকার করে গ্রহীতার বা সুবিধাভোগীর সুযোগ প্রদান করে তখন তাকে ত্যাগ বলা হয়। মনে করি একজন অফিস কর্মচারি অফিস যাওয়ার পথে দুর্ঘটনা কবলিত এক অপরিচিত আহত ব্যক্তিকে হাত পা ভাঙা অবস্থায় অচেতনভাবে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখতে পেলেন, যাকে সাহায্য করতে কেউ এগিয়ে আসছে না। এমতাবস্থায় তিনি চিন্তা করছেন যে- ‘একে সাহায্য করা দরকার। কিন্তু এখন যে আমার অফিস সময়, একে সাহায্য করলে অফিসে যাওয়া হবে না। অফিসে না গেলে উর্ধ্বতনের বকুনি তথা শাস্তি পেতে হবে এবং বেতনও কেটে নেওয়া হবে।’ শেষে ঐসবের তোয়াক্কা না করে তিনি আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন এবং যাবতীয় চিকিৎসা খরচও দিলেন, প্রয়োজনীয় খাবার, পথ্য নিজে সরবরাহ করলেন এবং সারা দিন তার পাশে থেকে তাকে দেখাশোনা, সেবা যত্ন করলেন। একজন আহত ব্যক্তিকে সহযোগিতার জন্য অফিস যাওয়া লোকটি যে নিঃস্বার্থভাবে ত্যাগস্বীকার করলেন সেটাই প্রকৃত ত্যাগ। এই ত্যাগকেই উদারতা বলা হয়।
শীল : শীলের সাধারণ অর্থ নীতি, নৈতিকতা, চরিত্র, সদাচার, আদর্শ বুঝায়। ত্রিপিটকে বিভিন্ন শীলের কথা উল্লেখ রয়েছে যেমন- পঞ্চশীল, ছয়শীল, অষ্টশীল, গৃহী দশশীল, প্রব্রজ্যা দশশীল, প্রাতিমোক্ষ শীল প্রভৃতি। বুদ্ধ শীলকে মহৎ অর্থে বিনয় বুঝিয়েছেন যা ভিক্খু সংঘের পরিচালিত হবার সংবিধান বিনয় পিটকে উল্লেখিত। অন্যদিকে একটি দেশ, তার সরকার ও জনগণ পরিচালিত হবার যে আইন সংবিধানে লিপিবদ্ধ থাকে সেগুলোও একেকটি শীল। কোন প্রতিষ্ঠানের যে নীতিমালা সেগুলোও শীল। আচরণগত দিক দিয়ে শীল দুই প্রকার- চারিত শীল ও বারিত শীল। যা করতে বলা হয়েছে তা চারিত শীল এবং যা করতে বারণ করা হয়েছে তা বারিত শীল। যে ব্যক্তি যত শীলবান সে ব্যক্তি তত সৎ। যে সমাজে যত শীলবান ব্যক্তির বসবাস সে সমাজ তত অন্যায়, অপরাধ মুক্ত। যে দেশ শীলবান সরকার দ্বারা পরিচালিত হবে সে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়।
সেবা : জন্মদাতা বয়োবৃদ্ধ মাতা-পিতাকে দেবজ্ঞানে সেবা করা, যেমন তারা আমাকে অপত্য স্নেহে লালন পালন করেছেন। আমাকে খাইয়েছেন, পড়িছেনে, চিকিৎসা করিয়েছেন। বিভিন্ন উপায়ে নিরাপত্তা দিয়ে রক্ষা করেছেন। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ, বাধ্যগত থেকে তাঁদের আদেশ, উপদেশ, নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। অনুরূপভাবে শিক্ষাগুরু- যার সান্নিধ্যে থেকে আমার অক্ষরজ্ঞান লাভ হয়েছে, বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান পেয়েছি, জেনেছি, বুঝেছি সেই শিক্ষককের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। অন্নদাতা- ক্ষুধা নিবারণের জন্য বা জীবন বাঁচানোর জন্য যার সহযোগিতায় অন্ন সংস্থান লাভ করেছি বা কোন দূর প্রবাসে কিংবা কোন অচেনা জায়গায় গিয়ে কারো আনুকুল্যে নির্বিঘ্নে খাওয়া-দাওয়া করতে পেরেছি সেই মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। ভয়ত্রাতা- ছোট বড় যে কোন বিপদে পড়ে যার ঐকান্তিক সহযোগিতায় বিপদমুক্ত হই বা বিপদে যিনি এগিয়ে এসে সাহস যোগান তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। পুত্র-কন্যাদাতা- অর্থাৎ শ্বশুর-শ্বাশুরিদের সেবা করতে হবে। মাতৃ-পিতৃ জ্ঞানে তাদের সেবা করতে হবে, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। এই পাচঁজনের প্রতি সবসময় কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। তাদের বিভিন্ন প্রয়োজন যথাসম্ভব মিটানোর চেষ্টা করতে হবে। নিজ কার্যের আগে তাদের কার্যাদি সম্পাদন করে দিতে হবে। এছাড়া বয়োবৃদ্ধ জ্ঞানী, শীলবান ব্যক্তিদের সেবা করা।
সম্মান : গৌরবনীয় ব্যক্তির গৌরব করা উত্তম মঙ্গল। বুদ্ধ, ধর্ম, সংঘ, ভিক্ষু, শ্রামণ, অষ্টশীলধারী, মাতা-পিতা, শিক্ষক, গুরুজন, বয়োজ্যেষ্ঠ, উচ্চ পদবীধারি ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান দিতে হবে। তাদের দেখলে গাত্রোত্থান, অভিবাবদন, অঞ্জলি দেওয়া হচ্ছে সম্মান। তাঁদের নিকট বিনীতভাব রাখা, আদেশ মানা, নম্র আচরণ করা, তাঁদের সামনে উচ্চ গলায় কথা না বলা। এছাড়াও বন্ধু বন্ধুকে সম্মান করতে হবে। স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে। অবমাননাকর কোন কথা বলতে পারবে না। একে অপরের প্রতি আস্থাশীল ও বিশ্বাসী থাকতে হবে। কোন প্রকার প্রতারণা করা চলবে না। যেহেতু সমাজের বিভিন্ন স্তরের, বিভিন্ন বয়সের মানুষদের সাথে প্রতিনিয়ত আমাদের চলতে হয়। এক্ষেত্রেও যার যে সম্মান প্রাপ্য তাকে সে সম্মান দিতে হবে। সে হোক বয়সে বড় অথবা ছোট, ধনী অথবা গরীব। ছোট হলেও কাউকে তাচ্ছিল্য করা যাবে না। এভাবে পরস্পরকে সম্মান দিলে সম্প্রীতিময় সমাজ গড়ে ওঠবে।
পুণ্যদান ও পুণ্যানুমোদন : সাধারণত ভিক্খু সংঘের সমীপে সংঘদান, পিণ্ডদান প্রভৃতি দান দিয়ে মৃত জ্ঞাতিদের উদ্দেশ্যে ‘ইদং নো ঞাতিনং হোতু সুখিতা হোন্তু ঞাতযো’ বলে পুণ্যদান করা হয়। কিন্তু পুণ্যদান শুধু এ অর্থে সীমাবদ্ধ নয়। পুণ্যদান বলতে নিজের ভালো কাজের অংশ অন্যের সাথে ভাগাভাগি করা। নিজের কৃতিত্ব, সাফল্য, যশ, কীর্তি, প্রশংসা প্রাপ্তীতে অন্যকে ভাগীদার করা। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে উপভোগ করা। ভালো কাজ করতে অন্যকে উৎসাহিত করা, তার সুফল বর্ণনা করাই হল পুণ্য দান। অনুরূপভাবে অন্যের ভালো কাজের প্রশংসা করা, স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে পুণ্যানুমোদন। অন্যের সাফল্যে, উন্নতিতে, কীর্তিতে খুশি হওয়া, আনন্দিত হওয়ার নাম পুণ্যানুমোদন।
ধর্ম দেশনা : ‘বুদ্ধ বলেছেন সব্বদানং ধম্ম দানং জিনতি।’ সকল দানের শ্রেষ্ঠ দান ধর্ম দান। দান মূলত দুই প্রকার- বস্তুগত দান ও অবস্তুগত দান। বস্তুগত দান বিভিন্ন ব্যবহার্য বস্তুকে বুঝায়। অবস্তুগত দান দেখা যায় না। সেটি বাক্যের মাধ্যমে মানুষের মনোপাত্রে সমর্পন করতে হয়। আর সেটিকেই ধর্মদান বলে। এর আরেক নাম হল চেতনা দান। এটি যেমন বুদ্ধের দুঃখ অন্তকারী তথা নির্বাণ প্রদায়ী চার আর্যসত্য ও আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ সম্বলিত লৌকিক লোকোত্তর সদ্ধর্ম দেশনা করা যাতে মানুষের মনে নব চেতনার উন্মেষ ঘটে। অনুরূপভাবে সমাজে নৈতিকতা, আদর্শ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, অধিকার, দায়িত্বসহ জীবনের সাথে সম্পৃক্ত প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে মানুষদের সচেতন করা। তাদের বুঝিয়ে দেওয়া যে এগুলো জীবনের অংশ। সুতরাং সুন্দর জীবন ও সমাজ গঠনের জন্য এ বিষয়ে জানতে হবে, লালন করতে হবে। এক কথায় ‘বাঁচতে হলে জানতে হবে।’ অবশ্য দেশনা, উপদেশ, পরামর্শ যা-ই বলি লিখিত আকারেও প্রদান করা হয়। বিভিন্ন বই, ম্যাগাজিন, লিফলেট, প্রকাশের মাধ্যমে তা সম্ভব। এছাড়াও গান, নাটক, স্থির চিত্র, চলচ্চিত্র এর মাধ্যমেও চেতনা দান বা সচেতনতা প্রদান করা যায়।
ধর্ম শ্রবণ : ধর্ম শ্রবন বলতে বুদ্ধকর্তৃক প্রচারিত নির্বাণ প্রদায়ী ধর্ম শ্রবণ করা। এছাড়াও বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক সভা সেমিনারে অংশগ্রহণ করে উপদেশ শুনা। নিজে নিজে ধর্মীয় বই পড়ে ধর্ম সম্বন্ধে জানা। এবং বিভিন্ন বিষয়ের উপর লিখিত বই পড়ে উপরোল্লিখিত বিষয়াদি সম্বন্ধে কম বেশী ধারণা রাখা। ধর্ম শ্রবণসহ যে কোন বক্তব্য শোনার ছয়টি ফল লাভ হয়। যেমন- অশ্রুত বিষয় শোনা হয়, শ্রুত বিষয় পরিষ্কার হয়, সন্দেহ দূরিভূত হয়, চিত্তে প্রশান্তি লাভ হয়, তুলনামূলক বিচার ক্ষমতা বাড়ে, জীবন সুখময় হয় এবং মৃত্যুর পরও সুগতি লাভ হয়।
দৃষ্টিঋজু কর্ম : দৃষ্টিঋজু কর্ম বলতে মিথ্যা দৃষ্টি বা মিথ্যা ধারণা থেকে মুক্ত মঙ্গলময় কর্ম। ভ্রান্ত, অলিক তথা কল্পনাবিলাস হুজুগে কর্ম নয়। এটি মূলত নিজের, অপরের তথা সমগ্র সমাজের কল্যাণ দায়ক কর্ম। সমাজের বিভিন্ন সেবামূলক কর্মই মূলত দৃষ্টিঋজু কর্ম। যেমন- রাস্তাঘাট পরিষ্কার করা, পুল তৈরি করা, সেবাসদন স্থাপন করে দেওয়া, বৃক্ষ রোপন, নলকূপ স্থাপন, কুয়া খনন, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, দুর্গতদের ত্রাণ সহযোগীতা দেওয়া, চিকিৎসা নিতে সামর্থ্যহীন রোগিদের সহযোগিতা করা, গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া, বিহার নির্মাণ, স্কুল নির্মাণ, বিহার এলাকা পরিষ্কার করা, স্কুল এলাকা পরিষ্কার করা, শীতার্তদের শীতবস্ত্র দান, গরিব দুঃখিদের সাহায্য করা প্রভৃতি।
বিনয় বা নৈতিকতায় সুশিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রই উপরোক্ত দশবিধ কর্মে আস্থাশীল এবং সেগুলোর সম্যক প্রতিপালনে বিশ্বাসী। একজন ব্যক্তি কখন বিনয়ী হয়ে ওঠে? সে যখন উপযুক্ত পরিবেশে থেকে যথাযথ শিক্ষা লাভ করে। এ শিক্ষা প্রথমে পরিবারেই লাভ হয়। একটি পরিবার যখন সৎ আদর্শে লালিত হয় তখন তার সদস্যরা অবশ্যই নৈতিক হয়ে উঠবে। তাই ছোটকাল থেকে একটি শিশুকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য মা-বাবার ভূমিকা অনেক। মা-বাবাই প্রতিটি সন্তানের আদি শিক্ষক বা পূর্বাচার্য। মা বাবা যদি জ্ঞানী, শীলবান, ধার্মিক, আদর্শবান, ভদ্র, নম্র, মিতভাষী এবং কুশল কর্মে ব্রতী হন তাহলে তাঁদের সন্তান কমবেশি ভালো হবে এটাই সত্য। অন্যদিকে মা বাবা যদি মুর্খ, দুঃশীল, দুরাচারি, অধার্মিক, প্রতারক, উগ্র, কর্কশভাষী এবং অকুশল কর্মে লিপ্ত থাকেন তাহলে তাঁদের সন্তান ভালো হওয়ার আশা অত্যন্ত ক্ষীণ। এজন্য শিশু বড় হয়ে অন্যের সাথে কিরূপ ব্যবহার করবে তা নির্ভর করে পরিবারের শিক্ষার উপর। প্রবাদে আছে ‘ব্যবহারেই বংশের পরিচয়।’ লোকনীতিতেও তাই বলা হয়েছে-
মাতা হীনস্স দুব্ভাসা পিতা হীনস্স দুকিরিযা
উভো মাতা পিতা হীনা দুব্ভাসাচ দুকীরিযা।
মাতা যদি হীন হয় সন্তান দুর্বাক্য ভাষণ করবে, পিতা হীন হলে দুষ্কর্ম করবে, মাতা পিতা উভয়ে হীন হলে দুর্বাক্য ও দুষ্কর্ম করবে। অন্য দিকে-
মাতা সেট্ঠস্স সুভাসা পিতা সেট্ঠস্স সুকিরিযা
উভো মাতা পিতা সেট্ঠা সুভাসাচ সুকীরিযা।
মাতা উত্তম হলে সন্তান সুবাক্য ব্যবহার করবে, পিতা উত্তম হলে সুকর্ম করবে, মাতা পিতা উভয়েই উত্তম হলে সুবাক্য ও সুকর্ম করবে।
মাতা বেরী পিতা সত্রু যেন বালে ন সিক্খিতা
সভা মজ্ঝে ন সোভেতি হংস মজ্ঝে বকো যথা।
যে মা বাবা শিশুকালে তার সন্তানকে না শেখায় তারা সন্তানের শত্রু হিসেবে বিবেচিত। হংস মাঝে যেমন বক শোভা পায় না তেমনি অশিক্ষিত মানুষও উন্নত সমাজে অযোগ্য হয়।
সমাজে একজন মানুষের ভালো-মন্দ আচার ব্যবহারের উপর পরিবারের পাশাপাশি বিদ্যালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সঙ্গী-বন্ধু, এবং সর্বোপরি সামাজিক পরিবেশ, প্রতিবেশ বহুলাংশে প্রভাবিত করে। সমাজবিজ্ঞানে এটিকে সামাজিকীকরণ বলা হয়।
বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থী কিরূপ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করছে, শিক্ষক-শিক্ষিকারা নৈতিক মানদণ্ডে কতটুকু উন্নত, শিক্ষার উপকরণ যেমন- পাঠ্যবিষয় কতটুকু জীবনমুখী, কর্মমুখী ও মানবতা সম্পতির্ক এবং লিঙ্গ, ধর্ম ও জাতি বৈষম্য মুক্ত ইত্যাদির উপরই তার মানসিক, বাচনিক ও কায়িকভাবে আচরণগত কাঠামো গঠিত হয়। বলা হয়- বিদ্যালয় হল জাতি গড়ার কারখানা আর শিক্ষক তার কারিগর।
সমাজে ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। তাই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় গুরুদের নিকট প্রত্যেকের পাঠ গ্রহণ জরুরী। এক্ষেত্রে নৈতিক মানদণ্ডে ধর্মীয় গুরুদের হতে হবে সুউচ্চ শিখরে প্রতিষ্ঠিত। তাদের পরিবেশনা বা বক্তব্য হবে মৈত্রি, করুণা, মুদিতা ও উপেক্ষা সম্প্রযুক্ত। এজন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠি, সম্প্রদায় ও জাতির উর্ধ্বে উঠে সর্বজনীন মঙ্গলদায়ক, বিশ্ব মানবতার নিরিখে প্রত্যেক ধর্মের উপদেশ হওয়া উচিত। সংকীর্ণতা, অন্ধ আনুগত্য, হিংসা, হত্যা, ভয় প্রদর্শন, বৈষম্য, জোর-জবরদস্তি প্রকৃত ধর্মে থাকতে পারে না। এরূপ মহান শিক্ষা প্রতিটি শিক্ষার্থী গ্রহণ করতে পারলে এ পৃথিবী হবে প্রকৃত মানব ভূমি।
একজন শিক্ষার্থী তার জীবনে উন্নতি করতে চাইলে তাকে অবশ্যই সঙ্গী বা বন্ধু নির্বাচনে সজাগ থাকতে হবে। যারা পড়াশোনায় ভালো, মেধাবী, মা-বাবা, শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, গুরু মান্যতা, ধর্ম মান্যতা, প্রতিবেশির সাথে ভালো ব্যবহারসহ নৈতিক আদর্শে চলে এবং অন্যদেরও চলতে উৎসাহিত করে তেমন ব্যক্তিদের ভালো বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। অন্যদিকে যারা এসবের বিরুদ্ধাচরণ করে তাদের বর্জন করতে হবে।
সমাজের সামগ্রিক পরিবেশ হল শিক্ষা গ্রহণের একটি বৃহৎ ক্ষেত্র। চারপাশের মানুষদের রীতি, নীতি, সংস্কৃতি, লোকাচার, পারস্পরিক সম্পর্ক, দেশপ্রেম, আইনের প্রতিপালন, রাজনৈতিক পরিবেশ ইত্যাদির পরিমণ্ডলে থেকে একটি মানব শিশু বেড়ে ওঠে। সমাজের সামগ্রিক চর্চার যেরূপ চিত্র সে দেখে সেরূপ প্রতিচ্ছবি তার চিন্তনে, মননে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আত্মস্থ করে। পরবর্তীতে সেই আত্মীকৃত ধারণা, বিশ্বাসগুলো বাহ্যিক আচরণে প্রকাশ করে।
সুতরাং, বলা যায় প্রতিটি সন্তানের বিনয় শিক্ষায় সামাজিকীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুষ্ঠু সামাজিকী করণের মাধ্যমে সমাজে যোগ্য সদস্য তৈরি হয়, আর যোগ্য সদস্যরাই একটি দেশের সুনাগরিক হিসেবে বিবেচিত। এভাবে বিনয় শিক্ষার দ্বারা সভ্য সমাজ গঠিত হয়। সভ্য সমাজই প্রতিরূপ দেশ গঠন করতে সক্ষম। তাই সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্র যাতে নৈতিকতার বাতাবরণে সমৃদ্ধ হয় সে জন্য সর্ব স্তরের মানুষদের বিনয়ে সুশিক্ষিত হওয়া অতীব জরুরি।
পরিশেষে বলতে হয় আমাদের শুধু শিক্ষিত নয় প্রয়োজন সুদক্ষ ও সুশিক্ষিত প্রজন্ম। এজন্যে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নিজেকে সেভাবে গড়ে তোলার প্রযত্ন করতে হবে। জীবনের বন্ধুর পথে অসত্য ও অন্যায়ের আবর্জনা স্তুপ থেকে সত্য ও ন্যায়ের অমূল্য রত্ন খুঁজে নেওয়ার সৎ সাহস রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে প্রতিটি ভালোর শুরুটা তিক্ত কিন্তু এর সযত্ন চর্চা মিষ্টফল প্রদান করে। ভালোর জন্যে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করতে হবে। লোকনীতিতে তাই বলা হয়েছে-
ব্যত্ত পুত্ত কিমালসো
অব্যত্ত ভারহারকো,
ব্যত্তকো পূজিতো লোকে
ব্যত্ত পুত্ত দিনে দিনে।
দক্ষ হও হে পুত্র! অলস হয়ে থেকো না, অকর্মা হলে অন্যের বোঝা বইতে হবে। সোৎসাহে বিদ্যা শিক্ষা কর, বিদ্বান ব্যক্তি জগতে পূজিত হয়।
অতএব, প্রতিটি শিক্ষায় নৈতিক দিকটির উপস্থিতি থাকলে সে শিক্ষা পরিপূর্ণতায় পর্যবসিত হয়। এরূপ শিক্ষিত ব্যক্তিই বিশ্ব জয় করতে সক্ষম হন। তথাগত বুদ্ধ তাঁর লৌকিক-লোকোত্তর দেশনায় এমন শিক্ষা গ্রহণের জন্য আমাদের উপদেশ দিয়ে গেছেন।
সহায়িকা :
১। ধম্মপদ
২। লোকনীতি
৩। সুত্ত নিপাত ও খুদ্দক পাঠ
৪। অঙ্গুত্তর নিকায়
৫। ভবঘুরে শাস্ত্র – রাহুল সাংকৃত্যায়ন
৬। https://www.jobsnow24.com
৭। https://bani.com.bd
Please follow and like us:

By pbsb

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *