মুক্তচিন্তার দলিল কালাম সূত্র: ভেন. বিপস্সি ভিক্খু

অঙ্গুত্তর নিকায়ের তিক নিপাতে মহাবর্গের কেশপুত্র সূত্রটি কালাম সূত্র নামে সমধিক পরিচিত। কারুনিক বুদ্ধ তাঁর প্রচারিত ধম্ম বা সত্যকে (A true way of life) জানার জন্য একটি মুক্ত দলিল দিয়ে গেছেন মানবজাতিকে। তাঁর ধম্মকে নিরপেক্ষ ও মুক্তচিন্তায় বিচার-বিশ্লেষণ পূর্বক গ্রহণ ও বর্জন করার আহবান করেছেন। বিশ্বখ্যাত বৌদ্ধ স্কলাররা এই সূত্রকে The Buddha’s Charter of Free Inquiry অর্থাৎ বুদ্ধ’র মুক্তচিন্তার দলিল হিসেবে দেখিয়েছেন। তিনি (বুদ্ধ) কোনকিছুকে দেখা, শুনা ও পড়ামাত্র বিচার-বিবেচনাহীন, অন্ধভাবে বিশ্বাস, জনশ্রুতিতে মতবাদ, বংশ পরম্পরাগত, বলাবলিতে, প্রাচীন ও ঐহিত্যগত বলে, শাস্ত্রে উল্লেখ আছে এমন, অনুমান নির্ভর, ধর্মগুরুর প্রতি শ্রদ্ধাবশত কোন মতবাদকে গ্রহণ না করার পরামর্শ দিয়েছেন।

বুদ্ধকালীন সময়। একদিন স্বশিষ্যসহ কোশলে বিচরণ করতে গিয়ে কেশপুত্র নামে কালামদের নিগমে প্রবেশ করলেন। বুদ্ধের সুকীর্তি বহু আগ থেকে তাদের বিঘোষিত হয়েছিল এভাবে- সেই ভগবান অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যা-আচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকবিদ, অনুত্তর, পুরুষ-দমন সারথি, দেবমানবের শিক্ষক বুদ্ধ, ভগবান। এমন উত্তম পুরুষ অর্হতের সাক্ষাৎ শুভকর। সেজন্য নিগমের কালামগণ বুদ্ধের পর্দাপনের খবর শুনে তাঁর দর্শনে গিয়ে কেউ কুশল সম্ভাষণ, কেউ বন্দনান্তে, কেউ অঞ্জলি নিবেদনে, কেউ নিজ নিজ পরিচয় প্রকাশ করে একপাশে উপবেশন করলেন। একপর্যায়ে বুদ্ধ ও কালামগণের আলাপচারিতায় তারা (কালামগণ) বুদ্ধকে বললেন- এই নিগমে বহু শ্রমণ-ব্রাহ্মণ আগমণ করেন। সকলেই নিজ নিজ মতবাদকে প্রশংসা করেন, অন্যজনের মতবাদকে অপবাদ দেন, নিন্দা করেন, গালি দেন। সেইরূপ অন্যজন শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণও নিজ মতবাদকে প্রশংসা করেন, অন্যজনের মতবাদকে অপবাদ দেন, নিন্দা করেন, পরকে গালি দেন। এসব শুনে আমাদের নানা সন্দেহ উৎপন্ন হয়, দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে যায়, এটা না ওটা কার মতবাদটি গ্রহণীয়-বর্জনীয় তা নিরূপণে ব্যর্থ হয়ে পড়ি। তখন বুদ্ধ উত্তরে বললেন,
এটি তোমাদের জন্য উপযুক্ত সময়। সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা উৎপন্ন হলে দ্বিধাবোধ হবে বৈ কি! কালামগণ, শোন ! যে বিষয়সমূহ প্রত্যাখ্যানের মানদণ্ডে পড়ে-

ক) কোন মতবাদ জনশ্রুতি (লোকের বলাবলি) আছে বলে গ্রহণ করবেন না,

খ) বংশ পরম্পরাগত বা ঐহিত্যগত বলে বিশ্বাস করবেন না,

গ) এটি সেরূপ না ওইরকম (গুজবে) তা অন্ধভাবে বিশ্বাস করবেন না,

ঘ) শাস্ত্রে উল্লেখ বা লিপিবদ্ধ হয়েছে বলে মেনে নিবেন না,

ঙ) অনুমান নির্ভর বা ভাসাভাসা কোনকিছু গ্রহণ করবেন না,

চ) তর্কপ্রসূত কোন মতবাদের প্রতি আস্থা স্থাপন করবেন না,

ছ) নিজের মতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও সত্য বলে গ্রহণ করবেন না,

জ) গুরুজনের প্রতি অন্ধভক্তিতে তাঁর প্রদত্ত মতবাদকে বিশ্বাস করবেন না।

বর্জনীয় উপায়: যখন নিজেরা জানবেন এগুলি অশুভ, অকুশল, অহিতকর ও নিন্দনীয় সেগুলি বর্জন বা পরিত্যাগ করবেন।

ক) এই বিষয়সমূহ অকুশল (খারাপ) তা বর্জন করবেন,

খ) এই বিষয়সমূহ অহিতকর তা বর্জন করবেন,

গ) এই বিষয়সমূহ বিজ্ঞ ও পণ্ডিত দ্বারা নিন্দনীয় তা বর্জন করবেন,

ঘ) এই বিষয়সমূহ সম্পাদন, গৃহীত হলে যা অহিতকর ও দু:খ উৎপন্ন হবে তা বর্জন করবেন।

গ্রহণ বা আচরণীয় উপায়: যখন নিজেরা জানবেন এইগুলি শুভকর, বিজ্ঞ-পণ্ডিতগণের প্রশংসনীয়, হিতকর তা গ্রহণ বা আচরণ করবেন।

ক) যে বিষয়সমূহ কুশল বা ভালো তা গ্রহণ করবেন,

খ) যে বিষয়সমূহ হিতকর তা গ্রহণ করবেন,

গ) যে বিষয়সমূহ বিজ্ঞ-পণ্ডিত দ্বারা প্রশংসনীয় তা গ্রহণ করবেন

ঘ) যে বিষয়সমূহ সম্পাদন, গৃহীত হলে হিতকর ও সুখ উৎপন্ন হয় তা গ্রহণ করবেন।

লোভ, দ্বেষ ও মোহ: তিনি আরো বলেন কালামগণ আপনারা কি জানেন, লোভ, দ্বেষ ও মোহ উৎপন্ন হলে মানুষের জন্য হিতকর না অহিতকর? কালামগণ বললেন, হ্যাঁ ভন্তে, এগুলি অহিতকর, অশুভকর। বুদ্ধ বললেন, হে কালামগণ ! লোভের বশবর্তী হয়ে মানুষ প্রাণীহত্যা করে, পরদ্রব্য হরণ করে, ব্যভিচার করে, মিথ্যাকথা বলে এবং অপরকেও সেই অধর্মের পথে নিয়ে যায় এবং দু:খ দেয়। দ্বেষ বা রাগের বশবর্তী হয়ে মানুষ প্রাণীহত্যা করে, পরদ্রব্য হরণ করে, ব্যভিচার করে, মিথ্যাভাষণ করে এবং অপরকেও সেই অধর্মের পথে নিয়ে দু:খ দেয়। মোহগ্রস্থ হয়ে মানুষ প্রাণীহত্যা করে, পরদ্রব্য হরণ করে, ব্যভিচার করে, মিথ্যাভাষণ করে এবং অপরকেও সেই অধর্মের পথে নিয়ে দু:খ দেয়। যখন জানবেন এগুলি অকুশল, দোষমূলক, বিজ্ঞজন কর্তৃক নিন্দিত, বিষয়সমূহ সম্পাদিত ও গৃহীত হলে দু:খ সাধিত হয়, তখন এগুলি পরিত্যাগ করবেন।  হে কালামগণ! মানুষের মনে যখন লোভ, দ্বেষ ও মোহ শূন্য হয়ে যায় তখন কি হিতকর না অহিতকর? কালামগণ বললেন, হ্যাঁ ভন্তে, এগুলি হিতকর, শুভকর। বুদ্ধ বললেন, হে কালামগণ ! মানুষ যখন লোভ, দ্বেষ ও মোহ শূণ্য হয়ে প্রাণীহত্যা, চুরি, ব্যভিচার, মিথ্যাভাষণ থেকে বিরত রাখেন এবং অপরকেও বিরত রাখেন তখন ততার সুখ উৎপন্ন হয়। যখন জানবেন এগুলি কুশল, দোষাবহ নয়, বিজ্ঞজন কর্তৃক প্রশংসিত, বিষয়সমূহ সম্পাদিত ও গৃহীত হলে হিতসুখ সাধন হয়, তখন এগুলি গ্রহণ করবেন। হে কালামগণ এই আর্যশ্রাবকগণ লোভ, দ্বেষ ও মোহমুক্ত হয়ে, জ্ঞানসম্পন্ন, আত্মসংযত, স্মৃতিযুক্ত হয়ে মৈত্রী,করুণা, মুদিতা ও উপেক্ষাশীল হয়ে বিহার করেন তখন তাঁরা বৈরীশূণ্য, বিদ্বেষশূণ্য ও বিশুদ্ধচিত্তে চারি আশ্বাস লাভ করেন। সেই চারি আশ্বাস কী? যদি পরলোক ও সুকর্ম-দুষ্কর্মের বিপাকের হেতু থাকে তাহলে মৃত্যুর পরে আমার গতি উচ্চ বা নিম্নগতি হবে-এটা প্রথম আশ্বাস। যদি পরলোক ও সুকর্ম-দুষ্কর্ম না থাকে তবে আমি বৈরীশূণ্য, বিদ্বেষশূণ্য, উপদ্রবশূণ্য হয়ে ই্হজীবনে সুখে জীবনযাপন করবো-এটা দ্বিতীয় আশ্বাস। যদি পাপ করলে পাপ উৎপন্ন হয় তাহলে আমি পাপ চেতনায় মন না দিয়ে থাকব। তা’তে আমার পাপ উৎপন্ন হবে না। এবং আমাকে পাপ স্পর্শ করতে পারবেনা-এটা তৃতীয় আশ্বাস। যদি আমি কোন পাপকর্ম না করি তা’হলে আমি শুদ্ধ জীবনযাপন করতে পারবো-এটা আমার চতুর্থ আশ্বাস। এভাবে আর্যশ্রাবকগণ চারি সুখ লাভ করেন। কালামগণ বলেলেন, ভদন্ত, অদ্ভূত, আমরা এখন বুদ্ধের শরণ গ্রহণ করছি, ধর্মের শরণ গ্রহণ করছি ও সংঘের শরণ গ্রহণ করছি। ভন্তে, ভগবান আজ থেকে আমাদের আজীবন শরণাগত উপাসক হিসেবে গ্রহণ করুন।

এ্ইটুকু বলে উপসংহার টানতে চাই, কোনকিছুকে দেখা, শ্রবণ ও পড়ামাত্রই বিষয়সমূহকে বিনা-বিচারে ঢালাওভাবে গ্রহণ না করে বুদ্ধের এহি পস্সিকো বা স্বয়ং এসে দেখার ধম্মকে যুক্তির কষ্টিপাথরে ঝালাই করে গ্রহণীয় বিষয়কে গ্রহণ ও বজর্নীয় বিষয়সমূহকে বর্জন করা উচিত। বুদ্ধ তথাগত তাঁর ধম্মে কখনো অন্ধবিশ্বাস ও ভ্রান্তধারণাকে স্থান দেয়নি। কিন্তু আমরা তাঁর মুক্ত ও স্বাধীনচেতার Discourse বিপরীতে ভিন্ন মতাদর্শে দুঃখ নামক নিউক্লিয়াসকে আবর্তন-বির্বতনে দিনাতিপাত করছি।

 

প্রবন্ধকার: Ven Bipassi Bhikkhu, সম্পাদক, তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি বিষয়ক, পাভিসবা।

তথ্যকণিকা:

ক) অঙ্গুত্তর নিকায়( ১ম খণ্ড)- অধ্যাপক সুমঙ্গল বড়ুয়া

খ) https://www.youtube.com/watch?v=A36tmCQ6soI

গ) https://mypathpedia.blogspot.com/2019/06/blog-post_14.html

Please follow and like us:
error0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close