প্রয়াত ভদন্ত সুগত প্রিয় মহাথেরো, মহামান্য ২য় সংঘরাজ পাভিসবা’র জীবনী

সংঘরাজ সুগত প্রিয় মহাথেরো গৌরবদীপ্ত একটি নাম, একটি মহান আদর্শ, দৃষ্টান্ত মূলক একটি ঐতিহাসিক, নিবেদিতপ্রাণ একজন শাক্য সিংহের পুত্র। তিনি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার- প্রসারের অন্যতম সংঘ পুরোধা, সমাজ সংস্কার আন্দোলনের নিরব কর্মী, প্রচার বিমুখ শাসন সদ্ধর্মের দরদী। থেরবাদ আদর্শের আলোকে মশাল ধারণ করে অন্ধ কু-সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজকে সদ্ধর্মের দীপ শিখা প্রজ্জ্বলন করার ক্ষেত্রে যে কয়েকজন আত্মত্যাগী মহাপুরুষের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ। পার্বত্য অঞ্চলে দুর্গম প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস রত অনগ্রসর, সদ্ধর্ম আলো বঞ্চিত মানুষের মাঝে ছিল তাঁর ধর্মাভিযান। তাঁর অক্লান্ত ত্যাগ তীতিক্ষা, কঠোর পরিশ্রম ও নিরবচ্ছিন্ন ধর্মাভিযান সস্নাত হয়ে কু-সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ নতুন করে জাগ্রত হয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে, তাঁর ফলশ্রুতিতে গড়ে উঠে বহু ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বৌদ্ধ বিহার। তিনি ছিলেন নিভৃতচারী সমাজ সংস্কারক, সদ্ধর্ম জাগরণের মহান ত্যাগী সংঘ মনীষা, বিনয়ানুকুল জীবন যাপনে নির্ভীক থেরবাদ আদর্শের অনুসারী। তিনি আজীবন নিরবে নিভৃতে অবিদ্যাচ্ছন্ন মানুষের মাঝে ধর্ম সুধা বিতরণ করে গেছেন। জাতীয় আন্তর্জাতিক বলয়ে নিজেকে তুলে ধরার কোন প্রবৃত্তি ছিলনা তাঁর অন্তরে। তিনি শুধু দিয়ে গেছেন কিন্তু কোনদিন প্রতিদান চাননি। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন অতিথি পরায়ন, উদার মানসিকতা, শিক্ষা বৎসল, ন্যায়পরায়ন, মৈত্রী পরায়ন, হাস্যোজ্জ্বল, মহৎ প্রাণ, মহান ত্যাগী, এক অনুপম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে তাঁর জীবনকে মহিমান্বিত করে তুলেছেন। ভিক্ষু কুল গৌরব, নিরহংকার, আত্মত্যাগী পুণ্যপুরুষ, মহামান্য সংরাজের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে তাঁর সুবিশাল কর্মজীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত তুলে ধরার সামান্য প্রয়াস।

ভদন্ত সুগতপ্রিয় মহাথেরো, মহামান্য ২য় সংঘরাজ, পাভিসবা
(জন্ম: ১৯৩২, মহাপ্রয়াণ: ২০১০)
জন্মঃ ১৯৩২ খ্রীষ্টব্দে তদানীন্তন অবিভক্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামটি সদর থানাস্থ ১০৭ নং বড়াদম মৌজায় এক বৌদ্ধ পরিবারে ননীলাল চাকম জন্মগ্রহণ করেন। ননীলাল ছিল তাঁর গৃহী নাম। পিতা যামিনী রঞ্জন চাকমা ও মাতা সুমিত্রা দেবী চাকমার ( অমৃত লাল, নৃচেন্দ্র লাল ও ননী লাল) সর্বকনিষ্ট ছিলেন ননী লাল। পরবর্তীতে এ ননী লালই মহামান্য সংঘরাজ সুগত প্রিয় মহাথেরো নামে খ্যাতি লাভ করেন। ননীলাল ছিলেন বাল্যকাল থেকে নিরোগী, সুঠাম দেহধারী ও অপূর্ব চেহারা। তিনি একাধারে ছিলেন ধর্ম পরায়ন ও অত্যন্ত মেধাবী। স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান হিসেবে তিনি অতি আদর যত্নে, স্নেহ-মমতায়, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে বেড়ে উঠেন। প্রকৃতির নৈসর্গিক গ্রাম্য পরিবেশে ননী লালের শৈশব জীবন কাটে।
১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে পার্বত্য অঞ্চলে প্রায় ৬০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জল মগ্ন হয়ে অধিকাংশ বৌদ্ধ পল্লী জলে নিমজ্জিত হয়। বালক ননী লালও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কৃতিত্বের সাথে সমাপ্ত করে সেখানেই তাঁর শিক্ষা জীবনের অবসান ঘটে। আধুনিক শিক্ষার উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে না পারলেও ধর্মীয় শিক্ষায় প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ।
সংসার জীবনঃ সচ্ছল পরিবারের সন্তান ননী লাল, মাতা-পিতার ঐকান্তিক অভিপ্রায় ননী লালকে সংসার জীবনে আবদ্ধ করে তাঁদের সুযোগ্য উত্তরসূরী তৈরি করা। মাতা-পিতার অভিলাষ পূরণের জন্য তিনি ১৯৫০ সালে একই মৌজায় ডেপ্যুছড়ি গ্রামের পরিমল চাকমা ও কিনেবী চাকমার কন্যা টুত্তরী চাকমার পানি গ্রহণ করেন। তাঁদের সুখের সংসারের ফুটফুটে পূর্ণ চন্দ্রের ন্যায় এক সন্তানের জন্ম হয়। ননী লাল পিতা-মাতার সুবাধ্য সন্তান হিসেবে পারিবারিক যাবতীয় দায় দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করতে থাকেন সংসারের প্রতি তাঁর কর্মনিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ দেখে পিতা-মাতা মনে করলেন তাঁদের সুযোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে বংশের প্রদীপ রক্ষা করবে। কিন্তু ‍নিয়তির নির্মম পরিহাস তাঁর সহধর্মীনি ও শিশু সন্তান উভয়ে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মুত্যু বরণ করেন। মাতা- পিতা ননীলালকে দ্বিতীয় বিবাহ করার জন্য প্র্রস্তাব দিলে তিনি প্রিয় বিয়োগ জনিত কারণে গার্হস্থ্য জীবনের প্রতি উদাসীন ও ভাবুক হয়ে উঠেন। জীবনতো এক বহমান নদীর মতো। প্রকৃতির নিয়মে যেমন বহমান নদীর গতি পরিবর্তন হয় ঠিক তেমনি জন্মন্তরের পুর্ণ শক্তির প্রভাবে ননী লালের জীবনের মোড় ঘুরে যায়। তিনি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হলেন সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাস ধর্মাবলম্বন করবেন। লক্ষাধিক লোক উদ্বাস্তু হয়ে ভারতের অরুণাচল, মিজোরাম, আসাম, ত্রিপুরা এবং দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জায়গায় বসতি স্থাপন করেন। বিশেষ করে রাঙ্গামাটি সদর থানার অন্তর্গত কয়েকটি গ্রাম যেমনঃ মগবান, বড়াদম, ঝগড়াবিল, হাজারী বাঘ ইত্যাদি গ্রামের লোকেরা স্থাপন করেন। সেই সমস্ত স্থানান্তরিত গ্রাম সমূহের মধ্যে অন্যতম হল বড়াদম গ্রাম।
শিক্ষা জীবনঃ– ননী লালের আবির্ভাবকালে পার্বত্য অঞ্চলে তেমন আধুনিক শিক্ষার আলো প্রবেশ করেনি। তাছাড়া তখনকার লোকদের প্রধান জীবিকা ছিল জুম ও জুম চাষ। মাটি ছিল খুবই উর্বর। সামান্য জুম চাষ করলে বৎসরের খাদ্য উৎপাদন হতো। তাদের কোন খাদ্যভাব ছিল না । তাই অধিকাংশ মাতা-পিতা আধুনিক শিক্ষার প্রতি ছিলেন উদাসীন। সৌভাগ্যের বিষয় ননী লালের বিদ্যোৎসাহী পিতা-মাতা তাকে আধুনিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত করার মানসে গ্রাম্য পাঠ শালাতে পাঠান। সেখানেই তাঁর লেখা পড়ার হাতে খড়ি হয়। ননী লাল ছাত্র হিসেবে মেধাবী ছিলেন। স্বনামধন্য ড. বেণী মাধব বড়ুয়ার গ্রামজাত মহামুনি পাহাড়তুলি চট্টগ্রামের নিবাসী যোগেশ চৌধুরী (বড়ুয়া) ছিলেন তাঁর শিক্ষক। তাঁর অসাধারণ প্রতিভা দর্শন করে ‍শিক্ষকেরা বালক ননী লালকে ভবিষ্যৎবাণী করেন “ এই বালক ভবিষ্যৎ একটা কিছু হতে পারেন।” লেখা পড়ার প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ থাকা সত্তেও তিনি বেশী দূর এগোতে পারেনি। কারণ সেই সময়ে পার্বত্যঞ্চলে পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব। তদুপরি মানুষের কোন অভাব অনটন ছিল না বিধায় আধুনিক শিক্ষার গুরুত্ব ছিল গৌণ। আর জনশ্রুতি আছে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য রাজার অনুমতি নিতে হতো। বিভিন্ন কারণে তৎকালীন মানুষের মধ্যে উচ্চ শিক্ষা লাভের তেমন কোন আগ্রহ ছিল না।
গৃহত্যাগঃ শৃংখলাবদ্ধ গার্হস্থ্য জীবন ত্যাগ করে উন্মুক্ত প্রব্রজ্যা ধর্মাবলম্বনে ননীলাল উদগ্রীব হয়ে আছেন। কিন্তু পিতা-মাতার অনুমতি কিভাবে আদায় করবেন চিন্তায় পড়ে গেলেন। ত্রিরত্নের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা সম্পন্ন পিতা মাতার প্রতি আস্থা রেখে করজোড়ে প্রার্থনা করলেন প্রব্রজ্যা ধর্ম গ্রহণের অনুমতি প্রদানের জন্য। ধার্মিক মাতা-পিতা তাঁর এই মহৎ কাজে বাঁধা দিলেন না। ইংরেজীর ১৯৫৩ সাল। তখন তাঁর বয়স ২১ বছর। পূর্ণ ভরা যৌবন। সাধারণতঃ যেই বয়সে মানুষ ভোগ বিলাসে মগ্ন হয়ে আমোদ-প্রমোদ জীবন অতিবাহিত করে। কিন্তু ননী লালের দীপ্ত যৌবন নির্লিপ্ত, নিরাসক্ত ও বন্ধন মুক্ত জীবনাচারের অপেক্ষায়। অবশেষে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে অগণিত লোকের সমাবেশে এক শুভলগ্নে রাঙ্গামাটি রাজ বিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত আনন্দ মোহন মহাথের’র নিকট ননীলাল শ্রামণ্য ধর্মে দীক্ষিত হন। শ্রামণ্য জীবনে তাঁর নাম রাখা হয় “সুগত প্রিয় শ্রামণের” তাঁর দীর্ঘ দিনের প্রতিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত করতে পেরে তিনি নিজেকে ধন্য মনে করলেন। সেদিন তিনি দ্বিজ জন্ম ধারণ করেন। শ্রামণ সুগত প্রিয় গুরুদেবের অপত্য স্নেহ সানিধ্যে শ্রামণ্য জীবনের নিয়ম-কানুন, ব্রতাদি নিষ্ঠার সাথে শিক্ষা করতে শুরু করলেন। গভীর মনোযোগের সহিত ধর্মীয় কার্যাদি সম্পাদন এবং আন্তরিকতার সাথে শ্রামণ্য ধর্ম প্রতি পালন করে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ধর্ম-বিনয়ের প্রতি অগাধ শ্রাদ্ধাবোধ থাকায় ত্রিপিটক শাস্ত্র অধ্যয়নে তাঁর প্রবল আগ্রহ বেড়ে যায়। গুরু সেবা ছিল তাঁর জীবনে মহান ব্রত। অনন্য সাধারণ প্রতিভা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও অমিত মেধা শক্তির প্রভাবে তিনি অচিরেই শ্রামণ্য ধর্মের নিয়ম-কানুন আয়ত্ব করে গুরুদেবের মন জয় করলেন।
উপসম্পাদাঃ– ইংরজীর ১৯৫৪ সাল। সুগত প্রিয় শ্রামণের জীবনে এক অবিস্মরণীয় প্রাপ্তি। ব্রহ্মচর্য জীবনের উচ্চতর পদবী অর্জন। বুদ্ধের বিনয় সম্মতভাবে অনেক পন্ডিত, প্রাজ্ঞ ভিক্ষু সংঘ এবং অগণিত ভক্ত মন্ডলীর উপস্থিতিতে জাঁকজমকপূর্ণভাবে এক শুভ তিথিতে সুভলং বৌদ্ধ বিহারে উদক সীমায় ভদন্ত পাঞ্ঞা সামী (প্রজ্ঞা স্বামী) মহাথের উপাধ্যায়ত্বে শুভ উপসম্পাদা গ্রহণ করেন। নব উপসম্পন্ন সুগত প্রিয়ের নতুন নাম করন করা হলো ‘সুগত প্রিয় ভিক্ষু’ অতীতের পুণ্য পারমী ও বর্তমানে সদিচ্ছার প্রভাবে তিনি বুদ্ধের মহান আদর্শে উজ্জিবিত হয়ে দেব-নর পূজিত ভিক্ষুত্ব জীবন ধারণ করে নিজেকে আত্মোৎসর্গ করেন। তখন তাঁর গার্হস্থ্য জীবনের সুপ্ত ধর্মীয় শিক্ষার অনুরাগ আরো প্রবল আকার ধারণ করে। তিনি গভীর মনোনিবেশ সহকারে কয়েক বছর গুরুর সানিধ্যে ত্রিপিটক শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। গুরুদেব তাঁর জ্ঞানের গভীরতা ও ত্রিপিটক শাস্ত্র অধ্যয়নের প্রবল আগ্রহ দেখে উচ্চতর শিক্ষার জন্য তাঁকে কুমিল্লার প্রেরণ করেন।
দশম সংঘরাজ পন্ডিত জ্যোতিপাল মহাথের’র সানিধ্যেঃ ১৯৫৮ সাল। সুগত প্রিয় ভিক্ষুর জীবনে এক সোনালী অধ্যায়। এ বছরে তিনি দীক্ষা গুরুর আশীর্বাদ নিয়ে কুমিল্লার লাকসাম কনক চৈত্য বিহারে গমন করেন ত্রিপিটক অধ্যয়নের জন্য। ভারতের রাষ্ট্রপতি পুরস্কারে ভূষিত পন্ডিত ধর্মাধার মহাথের’র সুযোগ্য উত্তরসূরী আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বৌদ্ধ পন্ডিত, বহু গ্রন্থ প্রণেতা, বিশ্বনাগরিক জ্যোতিপাল মহাথের ছিলেন তখন সেই বিহারের প্রধান অধ্যক্ষ। পন্ডিত জ্যেতিপাল মহাথের প্রথম দর্শনে নবীন ভিক্ষু সুগত প্রিয়ের প্রতি অপরিসীম করুণার উদয় হয়। আর সুগতপ্রিয় উপযুক্ত গুরুর সন্ধান এবং কল্যাণ মিত্রের সাক্ষাৎ পেয়ে মহানন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠেন। পন্ডিত জ্যোতিপাল মহাথের’র সার্বিক তত্ত্বাবধানে তিনি পালি ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। আচার্য দেবের ব্যবস্থাপনায় সুগতপ্রিয় ভিক্ষু ১৯৬৬ সালে ত্রিপিটক শাস্ত্রের পালি সূত্র ও বিনয় আদ্য, মধ্য ও উপাধি পরীক্ষার কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন। অন্তেবাসী সুগতপ্রিয় ভিক্ষুর ব্রত পরায়ন, জ্ঞানহরণের অদম্য স্পৃহা কর্মদক্ষতা লক্ষ্য করে আচার্যদেব মুগ্ধ হন। তাঁর প্রতি গভীর আত্মবিশ্বাস রেখে ত্রিপিটক শাস্ত্র অধ্যায়নের পাশা-পাশি আচার্যদেব তাঁকে শিক্ষানবিশ শ্রামণদের দেখা শুনার দায়িত্ব ভার অর্পণ করেন। “শাসন করা তারেই সাজে সোহাগ করে যে” এই নীতিতে বিশ্বাসী গুরুগত প্রাণ সুগতপ্রিয় আচার্য দেবের অর্পিত দায়িত্ব অক্ষরে অক্ষরে প্রতি পালন করার সচেষ্ট ছিলেন। তখনকার শিক্ষানবিশ শ্রামণদের মধ্যে কর্মবীর শীলভদ্র মহাথের তাঁর (সুগত প্রিয়) গুনকীর্তন বর্ণনা করছেন সৌভাগ্যক্রমে বর্তমান লেখক সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সেদিন তিনি গভীন শ্রদ্ধাভরে তাঁর অনুশাসনের স্মৃতিচারণ করলেন “ধর্ম বিনয়ের প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা ছিল। বিনয়ের ক্ষুদ্রানু ক্ষুদ্র শিক্ষাপদগুলো নিখুঁত ভাবে প্রতিপালন করতেন এবং অন্যান্যদেনকে বিনয়ানুকুল জীবনযাপনে উৎসাহিত করতেন।” মহান আচার্য পন্ডিত জ্যোতিপাল মহাথের সুগত প্রিয়ের বহুমুখী প্রতিভা, কঠোর অধ্যবসায় দর্শন করে পরিয়ত্তি (ত্রিপিটক অধ্যয়ন) শিক্ষার সাথে সাথে প্রতিপত্তি (ধ্যান-ভাবনা) শিক্ষা প্রদানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন যাতে তিনি (সুগতপ্রিয়) আধ্যত্মিক উৎকর্ষ সাধন করতে পারেন। সম্যক পথ প্রদর্শক আচার্য দেবের নিকট কর্মস্থান গ্রহণ করে সুগত প্রিয় ভিক্ষু গভীর ধ্যানানুশীলনে রত হন। আচার্যদেবের তত্ত্বাবধানে ধ্যানচর্চা করে তিনি উপলদ্ধি করতে পারেন ধ্যানই একমাত্র উপায় যা বৌদ্ধ ধর্মের চরম অনুধাবন করতে পেরে ব্রহ্মচর্য জীবন ধন্য হয়েছে মনে করলেন । কয়েক বছর নিষ্টার সাথে পরিয়ত্তি ও প্রতিপত্তি শিক্ষা অধ্যয়ন করে তিনি পারঙ্গমতা অর্জন করেন। অতঃপর তিনি আচার্যদেবের নিকট স্ব-গ্রামে প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছা পোষণ করলে আচার্যদেব পার্বত্য চট্টগ্রামে সদ্ধর্ম জাগরণের ক্ষেত্রে উপযুক্ত ভিক্ষুর প্রযোজন অনুধাবন করে তাঁকে সানন্দে অনুমতি দিলেন।
পুণ্যতীর্থ বড়াদম ধর্মাংকুর বৌদ্ধ বিহারঃ- প্রকিৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য মন্ডিত জনবহুল বৌদ্ধ অধ্যুষিত বড়াদম গ্রাম। ৩৪ নং রূপকারী ইউনিয়নের অন্যতম বৌদ্ধ আদর্শ গ্রাম। ইহা রাঙ্গামটি পার্বত্য জেলার বাঘাইছড়ি থানার অন্তর্গত পূর্বেই উল্লেখ করেছি। কাপ্তাই বাধের কারণে অত্র অঞ্চলে লোকেরা নতুর করে বসতি স্থাপন করে। কাপ্তাই বাধেঁ তাঁদের ঘর ভাঙ্গলেও মন ভাঙ্গেনি। সদ্ধর্ম পিপাসন্ন বৌদ্ধ নর-নারী তথা গণ্য-মান্য ব্যক্তিরা ধর্মানুশীলনের জন্য বৌদ্ধ বিহারের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে তাঁরা নবোদ্দমে “বড়াদম ধর্মাংকুর বৌদ্ধ বিহার” নাম দিয়ে ১৯৬৬ সালে একটি বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। কে জানত এই বৌদ্ধ বিহার একদিন পূণ্যতীর্থে পরিণত হবে। নবনির্মিত বড়দম ধর্মাংকুর বৌদ্ধ বিহারে প্রথম অধ্যক্ষ পদ বরণ করেন জনৈক মগ ভিক্ষু ( তাঁর নাম জানা সম্ভব হয়নি)।
১৯৬৭ সালে দীর্ঘ ৯(নয়) বছর কুমিল্লার ধ্যান সমাধি এবং ত্রিপিটক শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করে সুগত প্রিয় ভিক্ষু স্ব-গ্রামে ফিরে আসেন। “জ্ঞাতীগণের ছায়া সুশীতল” মহাকারুণিক বুদ্ধের এই উক্তি সেদিন তাঁর (সুগত প্রিয়ের) জীবনে প্রতিফলিত হয় স্ব-গ্রামে ফিরে এসে তিনি জ্ঞাতিদের কাছ থেকে বিপুল সংবর্ধনা লাভ করেন। নব প্রতিষ্ঠিত “বড়াদম ধর্মাংকুর বৌদ্ধ বিহারে” সেই বছর তাঁকে অধ্যক্ষ পদে বরণ করা হয়। গুণী জনেরাই গুণীর কদর জানেন বাস্তবিক পক্ষে বড়াদম বাসীরা সত্যিই গুনবান। পবিত্র ধর্মপদ গ্রন্থে বুদ্ধ বলেছেন-
“দুল্লভো পরিসাজ ঞ্ঞা ন সো সব্বত্থ জাযতি,
যত্থ সো জাযতি ধীরো তং কুলং সুখ মেধতি।”
‘মহা পুরুষর আবির্ভাব অতীব দুর্লভ। এরূপ সর্বত্র জন্ম গ্রহণ করেন না। যেখানে এই মহা পুরুষের আবির্ভাব হয় সেই দেশ ও জাতি ধন্য হয়।’
ঐতিহাসিক পূণ্যতীর্থ বড়াদম ধর্মাংকুর বৌদ্ধ বিহারে অবস্থান করে সুগত প্রিয় ভিক্ষু সমাজ সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন। এই বিহার ছিল তাঁর আজীবন সাধনাপীঠ। তিনি আমরণ কাল (১৯৬৭-২০১০) এই বিহারে অবস্থান করে শাসন সদ্ধর্ম কল্যাণের জন্য নিরন্তর কাজ করে গেছেন। উল্লেখ্য শুধুমাত্র (১৯৭৬-১৯৭৭) তিনি খাগড়াছড়ি বেতছড়ি বৌদ্ধ বিহারে অবস্থান করেন।
সমাজ সংস্কারকঃ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম (খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান) অঞ্চলে ১৩টি আদিবাসী জাতি সত্ত্বার আবাস ভূমি। এঁদের মধ্যে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, চাক সম্প্রদায় বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাব কালে এই সমস্ত আদিবাসী জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হয়। তন্মধ্যে চাকমা সম্প্রদায়ের বিশ্বাস ‘শাক্য বংশ’ থেকে চাকমা জাতির উৎপত্তি। এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন মতবিরোধ থাকলেও চাকমাদের এ দাবী অযৌক্তিক নয়। বুদ্ধের মূল ধারা শাক্যবংশের শাখা-প্রশাখা অংশ বিশেষ হলেও আদিবাসী জনগৌষ্ঠি এ সম্প্রদায় কালের বিবর্তনে ব্রাহ্মন্যবাদের উত্থান ও মুসলমানদের আক্রমণে প্রাণ রক্ষার তাগিদে সদ্ধর্ম আদর্শ হারিয়ে বিভিন্ন অবৌদ্ধ সংস্কৃতিতে লিপ্ত হয়ে অন্ধ কুসংস্কারে নিমজ্জিত হয়। যেমন বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা, গাং পূজা, থানমানা পূজা, মা-লক্ষী মা পূজা, দুর্গা পূজা, মনসা পূজা ইত্যাদি বিশেষ করে ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামে বসাবাসরত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর এক অন্ধকার যুগে বাস করেন। মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন রাউলী পুরোহিত নামে এক শ্রেণীর ধর্মীয় গুরু তখন ধর্মীয় কার্যাদি পরিচালনা করতেন। রাউলীদের পাশাপাশি ওঝা-বৈদ্যের প্রভাবে গোদা বৌদ্ধ সমাজের উপর নেমে আসে এক চরম বিপর্যয়। বৌদ্ধদের এমনতর দুর্দিনে সারমেধ মহোদয়ের আবির্ভাবে সদ্ধর্মের পুনরুত্থান শুরু হয়। তিনি সদ্ধর্ম দেশনার মাধ্যমে তান্ত্রিক মতের অসারতা এবং দেব-দেবী পুজায় পশু বলীর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালান। যার ফলে বৌদ্ধ সমাজ থেকে ধীরে ধীরে অন্ধ কুসংস্কার তিরোহিত হতে থাকে। চাকমা রাণী কালিন্দী সারমেধ মহাথেরর সদ্ধর্ম দেশনায় আকৃষ্ট হয়ে তাঁর নিকট থেরবাদ ধর্মে দীক্ষিত হয়। সারেমেধ মহাথেরর ধর্মাচরণে ও বিনিত ব্যবহারে রাণী এতই শ্রদ্ধা সম্পন্ন হন যে ১৮৫৭ সালে রাজ ‘পূর্ণাহ’ উপলক্ষে মহাসমারোহে তাঁকে আরাকানী ভাষায় উপাধি যুক্ত সীলমোহর প্রদানের দ্বারা সন্মাননা জানান। তখন থেকে সারমেধ মহাথের মহোদয় বাংলার বৌদ্ধদের নিকট সংঘরাজ হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। মূলতঃ অষ্টাদশ শতাব্দীতে সদ্ধর্মের আলোক বর্তিকা কিছুটা প্রজ্জ্বলিত হলেও ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝা-মাঝি পর্যন্ত এই প্রদীপ নিবু নিবু জ্বলতে থাকে। এই সুদীর্ঘ সময়ে উপযুক্ত ধর্মীয় গুরুর অভাবে তথাকথিত রাউলীদের প্রভাব পুনশ্চ বিভন্ন এলাকায় বিস্তার লাভ করে। তৎকালীন সময়ে চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের তেমন কোন ভিক্ষু নেই বললেই বলে চলে। মগ( মারমা) সম্প্রদায়ের ভিক্ষুরা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহার গুলোতে ধর্মীয় গুরু হিসেবে অবস্থান করতেন। কিন্তু তাঁরা সদ্ধর্ম প্রচার প্রসারে তেমন একটা অবদান রাখতে পারেননি। কারণ তাঁদের ধর্ম বিনয়ে পারদর্শীতা থাকলেও ভাষাগত সমস্যা ছিল প্রধান প্রতিবন্ধক ও অন্তরায়। তারপরও বিভিন্ন তিথিতে ধর্মীয় আচার অনুষ্টান গুলো মগ (মারমা) সম্প্রদায়ের ভিক্ষুদের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে পালন করা হতো। আনুষ্ঠানিকতা হলেও সৌভাগ্যের বিষয় দুর্দিদে তাঁরা আমাদের অস্থিত্ব রক্ষায় পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে যখন সদ্ধর্মের প্রদীপ ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে সেই যুগ সন্ধিক্ষণে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাগ্যাকাশে উদয় হয় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথের। ১৯৫৭ সালে চাকমা রাজা মেজর ত্রিদিব রায় সদ্য বার্মা প্রত্যাগত অগ্রবংশ মহাথেরকে রাজগুরু পদে বরণ করেন। রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথের অন্ধ কুসংস্কারাচছন্ন সমাজকে বৌদ্ধিক আদর্শে উজ্জিবিত করার মানসে পার্বত্য চট্টগ্রামে এক সংস্কার আন্দোলন গড়ে তোলেন। তিনি বিভিন্ন এলাকায় পরিভ্রমণ করে সদ্ধর্ম দেশনার মাধ্যমে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করেন। তাঁর সুললিত জ্ঞানগর্ভ সদ্ধর্ম দেশনায় সংস্কার আন্দোলরন এক নব দিগন্তের সৃষ্টি হয়। রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরর সমসাময়িক আরো এক মহাপুরুষ জ্ঞানশ্রী মহাথের (বর্তমানে উপসংঘরাজ, প্রধান অধ্যক্ষ চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহার) শুভাগমনে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাজ সংস্কার আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় বিভিন্ন কারণে রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথের চলে গেলেন ভারতে আর জ্ঞানশ্রী মহাথের চলে গেলেন সমতলে (চট্টগ্রামে) শাসন সদ্ধর্মের এই দুই দিকপাল চলে যাওয়াতে পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের এক বিরাট শুন্যতা সৃষ্টি হয়। এই সংকটাপন্ন মুহুর্তে সমাজ সংস্কার আন্দোলনের হাল ধরেন মহামান্য সংঘরাজ সুগত প্রিয় মহাথের। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরর ঘনিষ্ট ও স্নেহভাজন, পার্বত্যবাসীর অহংকার, পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের মনোনীত ও সফল সংঘরাজ এবং পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠা সদস্য মহামান্য সংঘরাজ সুগত প্রিয় মহাথের। এ পূণ্য পুরুষটি পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিটি সমাজ সংস্কার আন্দোলন, সমাজ উন্নয়ন, সদ্ধর্ম প্রচার ও প্রসারে ‍নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করে গেছেন।
মহামান্য সংঘরাজ সুগত প্রিয় মহাথের যৌবনের শুরু থেকে সারা জীবন পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের কার্যক্রমের সঙ্গে ওত-প্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য হচ্ছে পার্বত্য অঞ্চলে প্রতিটি ঘরে ঘরে বুদ্ধের উপদেশ বাণী প্রচার করে সর্বস্তরের মানুষকে বৌদ্ধিক আদর্শে অনুপ্রাণিত করা। ভিক্ষু সংঘের প্রতি বুদ্ধের উপদেশ ছিল “হে ভিক্ষুগণ! দিকে দিকে বিচরণ কর, বহুজনের হিতের জন্য, দেব মানবের হিতের জন্য দুই জন এক পথে যেওনা। হে ভিক্ষুগণ! তোমরা ধর্ম দেশনা কর-আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ ও পরিশেষে কল্যাণ এবং অর্থ সংযুক্ত, ব্যঞ্জনযুক্ত, পরিপূর্ণ-পরিশু্দ্ধ ব্রহ্মচর্য প্রকাশিত কর। ”
সংঘরাজ সুগত প্রিয় মহাথের পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে এবং বুদ্ধের পদাঙ্গ অনুসরণ করে পার্বত্য অঞ্চলে দুর্গম প্রত্যন্ত এলাকায় পদব্রজে পরিভ্রমণ করে মানব জাতির কল্যাণের জন্য দান কথা, শীল কথা, স্বর্গ কথা, ভাবনার কথা, নৈষ্ক্রম্যের কথা, আত্ম-পরিহাসের কথা, দুঃখ থেকে নিবৃত্তি লাভের কথা প্রচার করছেন। সুগত প্রিয় মহাথেরর নিরবচ্ছিন্ন ধর্মাভিযানে ম্লান হয়ে পার্বত্যঞ্চলের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের মাঝে ধীরে ধীরে সদ্ধর্ম চৈতন্য জাগ্রত হয়। তাঁর অমৃতময় ধর্ম দেশনা শ্রবণ করে সমাজে সদ্ধর্ম জাগরণের এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মানুষ উপলদ্ধি করতে পারে কিভাবে বৌদ্ধিক আদর্শে জীবন পরিচালনা করতে হয়। বৌদ্ধিক আদর্শে জীবন পরিচালনা করা মানেই দশবিধ কুশল কর্ম সম্পাদন করা। দশবিধ কুশল কর্ম হলো-দান, শীল, ভাবনা, সেবা, সন্মান, ধর্ম দেশনা, ধর্ম শ্রবণ, পুণ্য দান, পুণ্যানুমোদন ও দৃষ্টি ঋজু কর্ম। সংঘরাজ সুগতপ্রিয় মহাথের বিভিন্ন ধর্মীয় সমাবেশে দশবিধ কুশল কর্ম সম্পাদনের জন্য উৎসাহিত করতেন। তিনি উপলদ্ধি করেন কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজকে পরিবর্তনের জন্য উপযুক্ত ভিক্ষু এবং প্রতিটি এলাকায় বৌদ্ধ বিহার প্রয়োজন বৌদ্ধ শাসনে পুত্র দান ও আগত অনাগত ভিক্ষু সংঘের উদ্দেশ্যে বিহার দান করলে প্রতিনিয়ত পুণ্য সঞ্চয় হয় তিনি এই বিষয়ে তাঁর ধর্মদেশনায় মানুষকে অনুপ্রাণীত করতেন তাঁর অমীয়বর্ষী ধর্ম দেশনায় উদ্বু্দ্ধ হয়ে পার্বত্যঞ্চলের চতুর্দিক থেকে বহু কুল পুত্র প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। তৎসঙ্গে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি বর্গ সদ্ধর্ম পিপাসু দায়ক-দায়িকা গণ অপ্রমেয় পুণ্য লাভের অভিপ্রায়ে গ্রামে গ্রামে বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। মানব জীবনের আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধন, সমাজ উন্নয়ন, ধর্মীয় শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে প্রাচীনকাল থেকে বৌদ্ধ বিহারগুলো ভূমিকা ছিল অনন্য। পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্রমান্বয়ে বৌদ্ধ বিহার বৃদ্ধির পাশা-পাশি ‍ভিক্ষু-শ্রামনদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। এতে করে বৌদ্ধ সমাজের নব জাগরণের জোয়ার সৃষ্টি হয়। তখন পুত পবিত্র ভিক্ষু সংঘ দিকে দিকে বিচরণ করে সমাজকে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার জন্য মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের নামে যে দেব দেবীর পূজা ও পশুবলী দেওয়া হতো তাঁর বিরুদ্ধে জোর প্রচারণ চালান। মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন বৌদ্ধ ধর্ম পরিপন্থি আচার অনুষ্ঠানের পরিবর্তে ভিক্ষু সংঘ বৌদ্ধ নীতি সম্মত বুদ্ধ পূজা, সীবলী পূজা, অষ্টপরিস্কার দান, সংঘ দান, কঠির চীবর দান, বুদ্ধ মূর্তি দান, কল্পতরু দান ইত্যাদি প্রবর্তন করেন।
মহামান্য সংঘরাজ সুগত প্রিয় মহাথের পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের বার্ষিক অধিবেশনে গৃহীত বিবিধ পদক্ষেপের মধ্যে সদ্ধর্ম প্রচার প্রসার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে অনুধাবনের জন্য ভিক্ষু সংঘের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। সদ্ধর্ম প্রচার প্রসার বাস্তবায়ন ত্বারান্বিত করার লক্ষ্যে ভিক্ষু শুন্য বৌদ্ধ বিহারগুলোতে যাতে শীঘ্রই ভিক্ষু প্রদান করা হয়, বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব প্রাপ্ত পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের প্রতিনিধিকে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য তিনি পরামর্শ দিতেন। সদ্ধর্মের ধারক ও বাহক পূজনীয় ভিক্ষু সংঘ প্রত্যেক বিহারে অবস্থান করে সমাজ সংস্কার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করবে এই ছিল সংঘরাজ সুগত প্রিয় মহাথের দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন। দেব-মনুষ্য পুজিত আত্মনিবেদিত প্রাণ সংঘ সদস্যগণ পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান করে বৌদ্ধদের পবিত্রতম পার্বনাদি যেমন-বুদ্ধ পুর্ণিমা, আষাঢ়ী পুর্ণিমা, মধু পুর্ণিমা, প্রবারণা পুর্ণিমা, মাঘী পুর্ণিমা ইত্যাদি ধর্মীয় তিথি উদযাপনের জন্য উপাসক উপাসিকাদের অনুপ্রানিত করতেন। সদ্ধর্মানুরাগী উপাসক/ উপাসিকাগণ ভিক্ষু সংঘের অনুপ্রেরণার উজ্জীবিত হয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিথি বৌদ্ধ বিহারে উক্ত পার্বনাদি ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে উদযাপন করতেন। তখন বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের জয়ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠতো। গ্রামের আবাল বৃদ্ধ বনিতা স্বতঃস্ফুর্তভাবে এই সমস্ত পূণ্যানুষ্ঠানে যোগদানের ফলে প্রতিটি বিহার এক মহামিলন ক্ষেত্র ও মহোৎসবে পরিণত হতো। ধর্মীয় উৎসবাদি পালনের মধ্যে দিযে একে অপরের প্রতি সৌহাদ্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মৈত্রী সেতুর বন্ধর সুদৃঢ় হয়ে উঠে।
পুণ্যানুষ্ঠানে প্রাজ্ঞ-পন্ডিত ভিক্ষু সংঘ ধর্মীয় শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি বিদ্যার প্রয়োজনীয়তা ও সমাজ উন্নয়ন মূলক পরিবর্তন উপস্থাপন করতেন যার প্রভাবে বৌদ্ধ সমাজে এক আমূল পরিবর্তন দেখা দেয়। এই পরিবর্তন পার্বত্য বৌদ্ধ সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রগতিশীল সমাজ ব্যবস্থা ও কুসংস্কার মুক্ত সমাজ গড়ার চেতনার উন্মেষ গঠে। এই প্রজ্ঞাদীপ চেতনা শক্তির প্রভাবে সমাজের কুসংস্কার ক্রমান্বযে লুপ্ত হতে থাকে, বৃদ্ধি পায় বৌদ্ধ রীতি সম্মত মননশীল, আচার অনুষ্ঠান, পার্বনাদি, এই আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শুধু বাহ্যিক উন্নতি হয়নি, মনের পবিত্রতা সাধন ও শিক্ষা দী্ক্ষায় সমাজ অভিবৃদ্ধি লাভ করে। একজন বৌদ্ধ উপাসক/ উপাসিকার সর্বাগ্রে প্রযোজন বিকারগ্রস্ত মনকে পরিশুদ্ধ করা। দান, শীল, ভাবনা দ্বারা মন নির্মল পরিশুদ্ধ হয় । এজন্য অমাবস্যা, অষ্টমী, পূর্ণিমা তিথিতে ভিক্ষু সংঘরা উপাসক/উপাসিকাদের বিহারে উপসোথ শীল পালন ধ্যানানুশীলনের জন্য উৎসাহিত করতেন। ভিক্ষু সংঘের অনুপ্রেরণার উপাসক/উপাসিকা উপসোথ শীল প্রতিপালন ও ধ্যানানুশীলন করতেন। এতে করে পার্বত্যঞ্চলে বুদ্ধের প্রশংসিত নির্বাণ লাভের একমাত্র ধ্যানাভ্যাস আরম্ভ হয়। সংঘরাজ সুগত প্রিয় মহাথের উপলদ্ধি করেন শুধু আচার অনুষ্ঠান পার্বনাদি উদযাপন ও শিক্ষা দীক্ষায় উন্নতি লাভ করলে সমাজের পরিপূর্ণতা আসবে না, লোভ-দ্বেষ-মোহ গ্রস্ত পার্বত্য সমাজকে প্রকৃত বু্দ্ধের শিক্ষা দিতে না পারলে সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করা যাবে না। তাই তিনি ভিক্ষু সংঘকে পরামর্শ ‍দিতেন প্রতিটি এলাকায উপাসক-উপাসিকাদেরকে ধ্যান শিক্ষা দেওয়ার জন্য। কারণ ধ্যান ব্যতীত বুদ্ধের প্রকৃত জ্ঞান লাভ করা যায় না। প্রকৃত জ্ঞান না হলে সমাজ থেকে মিথ্যাদৃষ্টি দূর হবে না তথাগত বুদ্ধের নৈর্বানিক ধর্ম উপলদ্ধি করা যায় না। মূলতঃ ষাট দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ধ্যানানুশীলন আরম্ভ হলেও ধ্যানের প্রভাব তখন গৃহী বৌদ্ধ সমাজে তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি উপযুক্ত ধ্যানাচার্যের অভাবে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে ধ্যানানুশীলনের প্র্রতি উপাসক-উপাসিকাদের আগ্রহ দেখা যায় তা সংঘরাজ সুগত প্রিয় মহাথেরর অনুপ্রেরণার প্রতিফলন। তিনি এভাবে পার্বত্য বৌদ্ধ সমাজ সংস্কারের জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। শাসন সদ্ধর্ম কল্যাণে সমাজ সংস্কারের পাশাপাশি তিনি তাঁর হাতে গড়া অনেক শিষ্য-প্রশিষ্য তৈরী করেন।
পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের মাধ্যমে বন ভিক্ষু সংঘের গোড়াপত্তনঃ– খৃষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাবের সহিত ভারতের ইতিহাস, দর্শন ও ধর্মের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়। গৌতম বুদ্ধ হিমালয়ের পাদদেশে লুম্বিননী কাননে রাজ কুমার সিদ্ধার্থ রূপে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি যৌবনের প্রারম্ভে রাজ ঐশ্বর্য ত্যাগ করে ছয় বছর কঠোর সাধনার পর অবশেষে শুভ বৈশাখী পুর্ণিমায় চরম সত্য বোধি জ্ঞান লাভ করে জগতে বুদ্ধ নামে আখ্যায়িত হন। ঋষি পতন মৃগদাব অর্থাৎ সারনাথে তিনি সর্বপ্রথম সকল প্রাণীর সুখ ও কল্যাণার্থে তার সত্য ধর্ম প্রচার করেন। গৌতম বুদ্ধ স্বয়ং তাঁর নিকট সর্ব প্রথম দীক্ষিত পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষু কোন্ডিয় , ভদ্দীয়, ভপ্প, মহানাম ও অশ্বজিৎ কুলপুত্র যশ চার জন গৃহী পুত্র ও ৫০ জন কুল পুত্র সমন্বয়ে সর্বমোট ৬০ জনের যে সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তাদের প্রত্যেককে সকল প্রাণীর কল্যাণের জন্য ধর্ম প্রচারের আদেশ দান করেন। সুদীর্ঘ ৪৫ বছর ধর্ম প্রচার কালে বুদ্ধ বাংলাদেশে এসেছিলেন কিনা তা সঠিকভাবে বলা যায় না। তবে কিছু কাহিনী কিংবদন্তী বা কিছু বিলুপ্তি ইতিহাসে পাওয়া যায় যে, বুদ্ধ এদেশে এসেছিলেন এবং তার মুখ নিঃসৃতবাণী প্রচারের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের মানুষকে ধন্য করেছিলেন। বস্তুত খৃষ্টপূর্ব ৬০০ শতাব্দীতে সূচনা হয়ে ‍খ্রিষ্টীয় নবম-দশম শতাব্দী কাল পর্যন্ত অর্থাৎ পালযুগ পর্যন্ত বৌদ্ধধর্মের সাড়ম্বর অগ্রগতি অব্যাহত ছিল। পরবর্তীতে নানা উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে এদেশ থেকে বৌদ্ধ ধর্মের বিলুপ্তি হতে থাকে। ১৩০০ থেকে ১৮০০ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ের মধ্যে (বৌদ্ধদের) কি হলো তা আর জানা নেই। । এই সময় হলো বৌদ্ধদের অনুকার যুগ। তখন চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ ভিক্ষু ও বৌদ্ধ গৃহীরা অবৌদ্ধ সম্মত অবস্থার মধ্যে না হিন্দু, না বৌদ্ধ, না মুসলমান হয়ে জীবন যাপন করেছিলেন। বৌদ্ধদের যখন এই অবস্থা চলছিল এমন সময়ে এদেশে আরাকানী থেরবাদী ভিক্ষু সারমেধ মহোদয়ের আগমন ঘটে। ১৮৫৬ সালে বুদ্ধগয়ায় রাধাচরণ মহাথেরর সাথে সংঘরাজ সারমেধ মহাথেরর প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তাঁরই অনুরোধে সংঘরাজ সারমেধ ১৮৫৭ সালে চট্টগ্রামে আগমন করেন এবং চট্টগ্রামে কয়েকটি প্রসিদ্ধ তীর্থস্থান পরিদর্শন করেন। তখন তিনি তান্ত্রিক সত্যের অসারতা, দেব-দেবীর পূজা, পশুবলী, বিভিন্ন প্রকার মিথ্যাদৃষ্টি ইত্যাদির বিরুদ্ধে এবং থেরবাদী বৌদ্ধ ধর্মের রীতি নীতি সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার চালান। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের তিনি বিনয় সম্পর্কে তিনি নতুনভাবে জ্ঞান দান করেন। সেসময় এদেশের বৌদ্ধ পুরোহিত রাউলীদের উপসম্পদা বিনয় সম্মত হতো না্। ১৮৬৪ সালে সংঘরাজ সারমেধ চট্টগ্রামে মহামুনির পূর্ব পার্শ্বে হাজার ঘোনায় এক পার্বত্য ছড়ায় প্রথম বুদ্ধের বিনয়সম্মত ভাবে উপসম্পদা্র আয়োজন করেন। এতে সাতজন রাউলী পুরোহিত থেরবাদ সম্মতভবে উপসম্পদা গ্রহণ করেন। সুতরাং ১৮৬৪ সালে বাংলাদেশের থেরবাদ বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘ পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়। সদ্ধর্ম হিতৈষীণী চাকমা রাণী কালিন্দীর সহায়তায় ১৮৭০ সালে সংঘরাজ সারমেধ এ নেতৃত্বে রাঙ্গুনিয়া রাজানগর রাজ বিহারের পার্শ্বে বিনয়সম্মত পবিত্র ভিক্ষু সীমা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সীমাই বাংলাদেশী বৌদ্ধদের সর্ব প্রথম ঐতিহাসিক পাষান নির্মিত “ভিক্ষু সীমা” বাংলার প্রায় স্বনাম ধন্য কৃতি ভিক্ষু এই ভিক্ষু সীমায় উপসম্পদা লাভ করে সদ্ধর্ম প্রচার করেন। সুতরাং বাংলায় সদ্ধর্ম পুনরুত্থানে কালিন্দী রাণীর অবদান অপরিসীম।
আনুপূর্বিক ধারাবাহিকতায় সংঘরাজ সারমেধ প্রতিষ্ঠিত ভিক্ষু সংঘকে কেন্দ্র করে এদেশের মাটিতে যুগে যুগে জন্ম গ্রহণ করে অনেক ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ। তাঁদের পূণ্যহস্ত স্পর্শ গড়ে উঠে বহু জনহিতকর প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন। রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথের ছিলেন তেমন একজন সংগঠন প্রিয় ব্যক্তিত্ব। তিনি রাজগুরু পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর সদ্ধর্ম প্রচার-প্রসার ও শিক্ষা বিস্তারের জন্য নিম্নোক্ত প্রতিষ্ঠান সমূহ প্রতিষ্ঠা করেন।
১। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভিক্ষু সমিটি (বর্তমান পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ) ১৯৫৭ ইং
২। পার্বত্য চট্টগ্রাম বৌদ্ধ মিশন ১৯৬৮ ইং
৩। পার্বত্য চট্টগ্রাম বৌদ্ধ সমিতি ১৯৭০ ইং
৪। শিশু করুণা সংঘ (ভারত) ১৯৮৬ ইং
পার্বত্য ভিক্ষু সংঘে (পার্বত্য চট্টগ্রাম ‍ভিক্ষু সমিতি )যারা অকুণ্ঠ সমর্থন ও আন্তরিক সহযোগীতা দিয়ে কাজ করেছিলেন তাদের মধ্যে ভদন্ত বিমল বংশ মহাথের, উপসংঘরাজ জ্ঞানশ্রী মহাথের, সংঘরাজ সুগত প্রিয় মহাথের, অভয় তিষ্য মহাথের, ভদন্ত তিলোকন্দ মহাথের, ভদন্ত চিত্তনন্দ মহাথের, ভদন্ত বিমল বংশ মহাথের, ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের, ভদন্ত শ্রদ্ধালংকার মহাথের, ভদন্ত সত্যানন্দ মহাথের, ভদন্ত সুমনালংকার মহাথের প্রমুখ। তাঁরা শাসন সদ্ধর্ম ও সমাজের কল্যাণের জন্য ‍বিশেষতঃ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। এঁদের মধ্যে অনেকে বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক বিশাল কর্মকান্ড, স্কুল, কলেজ এবং আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে ধর্মীয় শিক্ষার পাশা-পাশি আধুনিক শিক্ষার ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদান রেখে যাচ্ছেন।
এই চলমান গতিধারার সাথে সংযুক্ত হন পরম পূজ্য সাধক প্রবর সাধনানন্দ মহাথের (বনভান্তে) তাঁর আবির্ভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌ্দ্ধ ধর্মের নব জাগরণের ক্ষেত্রে আরো তীব্র গতি আকার ধারণ করে। মহান সাধক সাধনানন্দ মহাথের (বনভান্তে) ১৯৪৯ সালে চট্টগ্রাম বিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত দীপংকর শ্রীজ্ঞান মহাথের নিকট শ্রামণ্য ধর্মে দীক্ষিত হন। তিনি দীর্ঘ ১২ বছর শ্রামণ্য অবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় গভীর অরণ্যে ধ্যান সমাধিতে মগ্ন ছিলেন। ১৯৬১ সালে পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের উদ্যোগে মহা সমারোহে দীঘিনালায় বোয়ালখালীতে সাধনানন্দ মহাথেরকে উপসম্পদা প্রদান করা হয়। শুভ উপসম্পদা অনুষ্ঠানে রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথের (পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের প্রতিষ্ঠা) উপসংঘরাজ জ্ঞানশ্রী মহাথের (তখন জ্ঞানশ্রী স্থবির) অন্যতম কর্মবাচা আচার্য (সীমা গুরু) হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। । অ্তএব পরম পূজ্য সাধনানন্দ মহাথের রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরর অন্যতম শিষ্য।
পরম পূজ্য সাধনানন্দ মহাথের (বনভান্তে) ধর্ম দেশনায় অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক কুলপুত্র গৃহ ধর্ম ত্যাগ করে পবিত্র ভিক্ষুত্ব জীবন গ্রহণ করে শাসন সদ্ধর্মের কল্যাণে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। পূজ্য বনভান্তে শিষ্য মন্ডলীর মধ্যে ভদন্ত প্রজ্ঞালংকার মহথের, ভদন্ত নন্দপাল মহাথের, ভদন্ত ভৃগু মহাথের, ভদন্ত ভদ্দজী মহাথের, ভদন্ত বশিষ্ট মহাথের, ভদন্ত বুদ্ধশ্রী মহাথের, ভদন্ত শাসন রক্ষিত মহাথের, ভদন্ত যোগাসিদ্ধি মহাথের, ভদন্ত বিশুদ্ধানন্দ মহাথের, ভদন্ত সৌরজগত মহাথের, ভদন্ত ইন্দ্রগুপ্ত মহাথের, ও ব্রহ্মদত্ত মহাথের প্রমুখ। পরম পূজ্য বনভন্তের শিষ্য মন্ডলীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমানা পেরিয়ে জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সদ্ধর্ম প্রচার-প্রসারে অবদান রেখে যাচ্ছেন। সম্প্রতি ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম , অরুণাচল ও বৌদ্ধদের অন্যতম তীর্থস্থান বুদ্ধ গয়ায় শাখা বন বিহার প্রতিষ্ঠা করে অনন্য সাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যুগের পরিক্রমায় ও কালের প্রয়োজনে “বন ভিক্ষু সংঘ’ ধ্যান সমাধির পাশা-পাশি আধুনিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত হওয়ার মানসে ভারতের বুদ্ধ গয়ায় শাখা বন বিহার ও রাজগীরে থাই মন্দিরে থাইল্যান্ডের বৌদ্ধদের কর্তৃক নির্মিত বৌদ্ধ বিহারে অবস্থানরত অনেক ভিক্ষু শ্রামণ স্কুল কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশুনা করছেন্ । দেরিতে হলেও বন ভিক্ষু সংঘের এই যুগান্তর কারী পদক্ষেপ সত্যিই প্রশংসনীয়।
পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের মাধ্যমে বন ভিক্ষু সংঘের গোড়াপত্তন বিষয় বস্তুত এই প্রবন্ধে অপ্রাসঙ্গিক হলেও উপস্থাপন করার কারণ হলো বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রাম বৌদ্ধ সমাজ। (বিশেষত চাকমাদের মধ্যে) মূলতঃ প্রধান দুই ধারাই বিভক্ত। ১। পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের অনুসারী, ২। বন ভিক্ষু সংঘের অনুসারী। উৎপত্তিগত দিক থেকে পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ থেকে বন ভিক্ষু সংঘের গোড়াপত্তন। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় ইদানিং কতিপয় ভিক্ষু ও গৃহী বন ভিক্ষু সংঘকে পরিশুদ্ধ সংঘ এবং পার্বত্য ভিক্ষু সংঘকে অপরিশুদ্ধ সংঘ হিসেবে সমাজের কাছে উপস্থান করেন। পরিশুদ্ধ এবং অপরিশুদ্ধ এই বিষয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কোন কোন জায়গায় এই তর্ক বিতর্ক এমন আকার ধারণ করে এক পর্যায়ে অনাকাঙ্খিত ঘটনাও সংঘটিত হয়েছিল। দীঘিনালা এবং বিলাইছড়িতে সংঘটিত ঘটনা তার উজ্জল দৃষ্টান্ত। সমাজের এ দ্বিধা বিভক্ত মনোভাব আমাদের জন্য এক অশনি সংকেত। কারণ একটা জাতি বা সমাজ সুসংগঠিত না হলে সেই জাতির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব রক্ষা করা সুদূর পরাহত। ভারত বর্ষে বৌদ্ধ ধর্মের উৎপত্তি। কিন্তু ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধ ধর্ম বিলুপ্তির মূল যে কয়েকটি প্রধান কারণ হিসেবে ঐতিহাসিক এবং গবেষকরা চিহ্নিত করেছেন তন্মধ্যে ভিক্ষু সংঘের অনৈক্য অন্যতম কারণ। আমরা কি তাহলে সেই পথের ধাবিত হচ্ছি ? বুদ্ধ আমাদেরকে উপদেশ দিয়েছেন “সংঘের একতা শক্তি সুখ দায়ক” । আমাদের উচিত করুণাময় বুদ্ধের মৈত্রী পতাকা তলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পরিশুদ্ধ এবং অপরিশুদ্ধ সংঘ এই অবান্তর অযৌক্তিক বিষয় পরিহার পূর্বক সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সবাই বুদ্ধ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ভিক্ষু সংঘ এই মনোভাব ধারণ করে এগিয়ে যাওয়া। নচেৎ আমাদের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন।
সংঘরাজ সুগত প্রিয় মহাথের ছিলেন একজন উদার মানবতাবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষু। তাঁর চিন্তা ধারা ছিল সব সময় সার্বজনীন সংকীর্ণতার উর্ধ্বে। সংঘরাজ তাঁর জীবদ্দশায় ভিক্ষু সংঘের এ দ্বন্ধ বিভাজন নিরসনের জন্য আন্তরিক ভাবে কামনা করেছিলেন। তাঁর ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল ভিক্ষু সংঘকে কোন প্রকার বৈষম্য না করে দায়ক/ দায়িকারা সম দৃষ্টিতে চতুপ্রত্যয় প্রধান করে সমগ্র ভিক্ষু সংঘকে রক্ষণা-বেক্ষণের জন্য দায়িত্বশীল হবেন। কারণ ভিক্ষু সংঘ এবং গৃহী সংঘ একে অপরের পরিপূরক। একটা পুকুরে যখন পদ্মফুল প্রস্ফুটিত হয় তখন পুকুরের শোভা বর্ধন করে। তেমনি পদ্মফুল সদৃশ্য ভিক্ষু সংঘ বৌদ্ধ সমাজকে গৌরবান্বিত, সৌন্দর্য্য বর্ধিত ও সমৃদ্ধশালী করে। দূষিত জলে কিংবা জল শূন্য পুকুরে যেমন পদ্মফুল জন্মাতে পারেনা তেমনি প্রজ্ঞাহীন অন্ধ শ্রদ্ধাসম্পন্ন সমাজে জ্ঞানী গুণী ভিক্ষু সংঘের আবির্ভাব হয়না। মহামান্য সংঘরাজের প্রত্যাশা ছিল বৌদ্ধ গৃহী সমাজ প্রজ্ঞা সম্প্রযুক্ত শ্রদ্ধাবান হবে, প্রজ্ঞা সম্প্রযুক্ত শ্রদ্ধাবান দায়ক দায়িকা উৎপন্ন হলে আত্মত্যাগী সংঘ সদস্য গণের মূল্যায়ন হবে। এ যাবৎ বৌদ্ধ সমাজ এইটুকু অগ্রগতির মূলে সাধক প্রচারক ও সমাজ সংস্কারক ত্রি শ্রেণীর ‍ভিক্ষুর অবদান অপরিসীম। যার যে অবস্থানে থেকে সমাজ তথা জাতির কল্যাণের কাজ করে এ ছিল সংঘরাজের স্বপ্ন। সংঘরাজের এ শুভ চেতনা যদি বাস্তবে পরিণত হয় তাহলে তাঁর প্রতি যথার্থ সন্মান গৌরব এবং শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হবে।
মহাথের বা মহাস্থবির বরণঃ ১৯৭৪ সাল। সুগত প্রিয় স্থবিরের জীবনে আরো একটি স্মরণীয় অভিধা প্রাপ্তি। তখন তাঁর পবিত্র ভিক্ষু জীবনের ২১ বছর পূর্ণ হয়। তার সুদীর্ঘ ব্রহ্মচর্য জীবনের স্বীকৃতি স্বরূপ পার্বত্যঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে অগণিত ভক্তমন্ডলী এবং শতাদিক ভিক্ষু সংঘের উপস্থিতিতে বড়াদম ধর্মাংকুর বৌদ্ধ বিহার প্রাঙ্গণে মহা সমারোহে তাকে সন্মান সূচক “মহাস্থবির” পদে অভিষিক্ত করা হয়।
পালি “থের” শব্দের অর্থ বাংলা স্থবির। স্থবির তিন প্রকার-
১। জাতি স্থবির ( বৃদ্ধ হয়ে যে সব ভিক্ষু আপনা আপনি স্থবির হন)
২। ধর্ম স্থবির (ধর্ম জ্ঞানে উন্নত ভিক্ষু)
৩। সম্মতি স্থবির (উপসম্পদা লাভের পর ১০ বছর পূর্ণ ভিক্ষু)
সম্মতি স্থবির ‍যিনি তিনি তাকে ভিক্ষু সংঘ “থের সম্মতি” কম্মাবাচা পাঠ করে থের বা স্থবির হিসেবে বরণ করে। বুদ্ধের সময় অর্থাৎ প্রাপ্ত ভিক্ষু ভিক্ষুণীদের থের থেরী বলা হত । পালি সাহিত্য খুদ্দক নিকায়ের অন্তর্গত থের ও থেরী দুটি গ্রন্থে থের থেরীদের জীবন কাহিনী ও তাঁদের আত্মোপলদ্ধি মূলক অভিব্যক্তি পাওয়া যায়। কিন্তু মহাথের বা মহাস্থবির শব্দটি পালি সাহিত্যের কোন গ্রন্থে পাওয়া যায় না। আর তা কবে থেকে প্রচলন হয়েছে তার কোন সুনির্দিষ্ট সময় পাওয়া যায় না। উপরন্তু কম্মবাচা গ্রন্থেও “মহাথের সম্মতি” কম্মবাচার কোন উল্লেখ নেই।
তীর্থ ভ্রমণঃ ধর্মোপলদ্ধি, পুণ্যার্জন ও বুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থান গুলোর বিষয়ে জ্ঞানাহরণের জন্য তীর্থ দর্শন অপরিহার্য। পবিত্র তীর্থস্থান গুলো দু’ভাগে ভাগ করা যায়। একটি মহাতীর্থ এবং অন্যটি তীর্থ। মহাতীর্থ অর্থ তীর্থের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। মহাতীর্থ গুলো হলো-লুম্বিনী, বুদ্ধগয়া, সারনাথ ও কুশিনগর। এছাড়াও বুদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য অনেক জায়গায় ভ্রমণ করেছিলেন এবং তাঁর আদেশে শিষ্য প্রশিষ্যরা বিভিন্ন জায়গায় ধর্ম প্রচার করেছেন। সে রকম কয়েকটি তীর্থস্থান হলো -কপিলাবস্তু, শ্রাবস্তী , রাজগৃহ, বৈশালী, কৌশাম্বী, সাংকস্য ইত্যাদি। সংঘরাজ সুগত প্রিয় মহাথের ১৯৮৩ ইংরেজীতে চারী মহাতীর্থসহ কপিলাবস্তু, শ্রাবস্তী , রাজগৃহ, বৈশালী, কৌশাম্বী, সাংকস্য, নালন্দা ইত্যাদি তীর্থস্থান গুলো দর্শন করেন। ঐ বছর তিনি বিশ্ব বিখ্যাত বিদর্শনাচার্য শ্রী সত্য নারায়ণ গুয়েঙকার বুদ্ধগয়ায় শাখা বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রে ধ্যানানুশীলন করেন।
সংঘরাজ পদে অভিষেকঃ– ২০০৮ সালে। সুগত প্রিয় মহাথের জীবনে এক অভূতপূর্ব প্রাপ্তি, অবিস্মরণীয় বছর। রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথের শেষ কৃত্যানুষ্ঠানের ২ দিন পূর্বে ৪ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটি চাকমা রাজ বিহার প্রাঙ্গণে হাজার অধিক মহান ভিক্ষু সংঘ এবং অগণিত নর-নারীর উপস্থিতিতে পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের বার্ষিক মহাসম্মেলনে সুগত প্রিয় মহাথেরকে সংঘরাজ পদে বরণ করা হয়। উল্লেখ্য সুদীর্ঘ ২৪ বছর পর ২০০১ সালে রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলে দীঘিনালাস্থ তপোবন বিহার প্রাঙ্গণে পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের বার্ষিক অধিবেশনে ঐ বছর তাঁকে ( অগ্রবংশ মহাথেরকে) মহাসংঘ নায়ক পদে বরণ করে শ্রদার্ঘ্য নিবেদন করেন। রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরোর “মহাসংঘনায়ক” পদে স্থলাভিষিক্ত হন সুগত প্রিয় মহাথের। পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের বার্ষিক মহা সম্মেলনে সর্ব সম্মতিক্রমে ঐ দিন ভিক্ষু সংঘের সর্ব্বোচ্চ পদবী “মহাসংঘ নায়ক” এর পরিবর্তে ‘সংঘরাজ’ করা হয়। সুগত প্রিয় মহাথের সুদীর্ঘ ৫৭ বছর ব্রহ্মচর্য জীবনের সর্ব্বোচ্চ সৎ মর্যাদা প্রাপ্তি শুধু ভিক্ষু সংঘকে গৌরবান্বিত করেননি সমগ্র বাংলাদেশী বৌদ্ধদেরকে কৃতার্থ ও ধন্য করেছেন।
মহাপ্রয়াণঃ ২০১০ সালে। ২৫ শে সেপ্টেম্বর বার্ধক্য জনিত কারণে মহামান্য সংঘরাজ তাঁর আজীবন সাধন ভূমি “বড়াদম ধর্মাংকুর বৌদ্ধ বিহারে” শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। “অনিচ্চা বতা সংখারা” সংস্কার মাত্রই অনিত্য। পতন হলো এক উজ্জল নক্ষত্রের। তাঁর মহপ্রয়ানে বৌদ্ধ সমাজে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা সহজে পূরণ হবার নয়। অবসান হলো পার্বত্য বৌদ্ধ সমাজের একটা ইতিহাসের অধ্যায়।
লিখেছেন: ড. অমর কান্তি চাকমা, প্রভাষক, বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজ, মিরপুর, ঢাকা
Please follow and like us:
error0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close