প্রয়াত ভদন্ত জ্ঞানধ্বজা মহাথেরো’র সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য

জন্ম:  ভদন্ত জ্ঞানধ্বজা মহাথেরো মহোদয়ের জন্ম ১৯৫৮ খ্রিঃ অব্দের ২ আগস্ট। জন্ম স্থান কদমতলী, ৩নং বর্নাল। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জিলার মাটিরাঙ্গা উপজেলাধীন ৩নং বর্নাল ইউনিয়ন এর কদমতলী গ্রাম ছিল একটি বর্ধিঞ্চু গ্রাম। তাঁর পিতার নাম মৃত চিন্তাধন চাক্‌মা ও মাতা মৃত রজকিনী চাক্‌মা। আশৈশব কালেই পিতৃ-মাতৃহারা জ্ঞানধ্বজা মহাথেরো।

প্রব্রজ্যা: ১৯৭৪ খ্রি. অব্দের ১৬মে তখনকার উদীয়মান চাক্‌মা ভিক্ষু ভদন্ত উঃ পাণ্ডিতা ভিক্ষুর নিকট শ্রামণের হিসেবে দীক্ষা গ্রহণ করে বুদ্ধের শাসন-সদ্ধর্মে প্রবেশ করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৭ (সতের) বছর। জাতীয় পরিচয়পত্র ও সেকেন্ডারী স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার সনদপত্র অনুসারে তাঁর জন্ম তারিখ নির্ধারিত হওয়ার কারণে সঠিক জন্ম তারিখ এর হের ফের হওয়া স্বাভাবিক।  আমাদের প্রয়াত ভদন্ত জ্ঞানধ্বজার জন্ম তারিখ নির্ধারণের বেলায়ও অনুরূপ গণনার আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে কিনা জানা নেই। তাঁর জীবদ্দশায় বয়স সংক্রান্ত ব্যাপারে আমাদের মধ্যে কোনো আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়নি।

উপসম্পদা: ভিক্ষু সনদপত্র অনুসারে ভিক্ষু হিসেবে তাঁর উচ্চতর দীক্ষা গ্রহণের তারিখ ১৯৭৫ খ্রি. অব্দের ১৮ মে। শ্রামণের দীক্ষা গুরু ভদন্ত উ. পাণ্ডিতা ভিক্ষু উচ্চতর দীক্ষা গ্রহণের দিনও আচরিয় হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

Ven. Jnanadhwaja Mahathera

তাঁর লেখাপড়া: ভদন্ত জ্ঞানধ্বজা মহাথেরো উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। তিনি ১৯৭৭ খ্রি. অব্দে সেকেন্ডারী স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা ১৯৭৯ খ্রি. অব্দে উচ্চতর মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা ও ১৯৮৪ খ্রি. অব্দে বি.এ. (ব্যাচেলর অব আর্ট) ডিগ্রী অর্জন করেন। ইংরেজী ও বাংলা উভয় ভাষায় তাঁর অশেষ দক্ষতা ছিল। বিশেষ করে ইংরেজী ভাষায় তাঁকে শব্দ ভান্ডারগারিক হিসেবে আখ্যা দেয়া যায়। ইংরেজী ভাষায় এমন কোন শব্দ খুঁজে পাওয়া যেতো না- যা তিনি জানতেন না। তিনি একজন দক্ষ ব্যাকরণ বিশারদও বটে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজী ভাষা ও ব্যাকরণের উপর তিনি ছাত্র/ছাত্রীদেরকে নব নব পদ্ধতি অবলম্বন পূর্বক এমনভাবে পাঠদান ও পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন করে দিতেন- তা’তে তাঁর ছাত্র/ছাত্রীরা শতভাগ কৃতিত্বের সাথে ঐ বিষয়টি পাশ করার ক্যারিশমা দেখাতো। তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ইংরেজী ভাষা জ্ঞানে ঋদ্ধ ছাত্র/ছাত্রীরা ইংরেজী সাহিত্যে বিশ্ব বিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানা যায়।

১৯৭৯ খ্রি. অব্দে ’পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রমে’র উদ্যোগে অনাথাশ্রম আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তার আগে এ অনাথাশ্রমের আশ্রিত এতিমরা ৫(পাঁচ) কিলোমিটার দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে ’দিঘীনালা উচ্চ বিদ্যালয়ে’ পড়ালেখা করতে যেতে বাধ্য হতো। ভদন্ত জ্ঞানধ্বজা মহাথেরো ১৯৮১ খ্রি. অব্দে অনাথাশ্রম আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তখন থেকে তাঁর সাখে আমার পরিচয় ও হৃদ্যতা ক্রমশ বাড়তে থাকে।
অতীব মর্মযাতনার বিষয় হল এই- ১৯৮৬ খ্রি. অব্দের ১৪ জুন থেকে ১৯৬১ খ্রি. অব্দে আমার গুরু মহামান্য পরমপূজ্য ভদন্ত জ্ঞানশ্রী মহাথেরো কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ’পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম’ নবাগত বাঙ্গালী শরণার্থীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পুরোপুরি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। তখন পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রমে ৩০০ (তিনশত) জন এতিম ছাত্র আবাসিকভাবে অবস্থান করতো। অনাথাশ্রম আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ে তারা নানা শ্রেণীতে অধ্যয়নরত ছিল। সেদিন ছাত্রদের ৬ (ছয়) টি আবাসিক ভবন, একটি বৌদ্ধ মন্দির নাম ধর্মোদয় বৌদ্ধ বিহার, একটি মেডিকেল সেন্টার, পাকঘরসহ ৩০০ (তিনশত) জন ছাত্র একসঙ্গে খাবার গ্রহণের ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি ভোজনালয়, একটি টেকনিক্যাল স্কুল, একটি পাঠাগার পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ৩০০ (তিনশত) ছাত্রদের মধ্যে বান্দরবান পার্বত্য জেলা থেকে আগত ৫০ (পঞ্চাশ) জন ছাত্র রাতের অন্ধকারে পালিয়ে এসে রাঙ্গামাটিস্থ মোনঘর শিশু সদনে আশ্রয় নেয়। বাকী ২৫০ (দু’শত পঞ্চাশ) জন ১২ (বার) জন বৌদ্ধ ভিক্ষুর সাথে ভারতের পার্বত্য ত্রিপুরায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ঐ ১২ (বার) জন বৌদ্ধ ভিক্ষুর মধ্যে ভদন্ত জ্ঞানধ্বজা মহাথেরো ছিলেন অন্যতম।

শরনার্থী জীবন ভারতে:  ভদন্ত জ্ঞানধ্বজা মহাথেরো ১৯৮৬ খ্রি. অব্দের ১৪ জুন হতে ১৯৯৭ খ্রি. অব্দে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ১২ বৎসর ভারতের পার্বত্য ত্রিপুরার করবুক শরণার্থী ক্যাম্পে মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হন। সীমিত পরিসরে তাকুম বাড়ী শরণার্থী ক্যাম্পেও তিনি শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন বলে জানা যায়। ঐ ক্যাম্পের ছাত্র/ছাত্রীদেরকে একত্রিত করে তিনি সেখানে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার তাগিদ অনুভব করেন। তাঁর স্বপ্রতিষ্ঠিত স্কুলে তিনি নিজেই সেখানে শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হন। বাংলাদেশে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত তিনি সেখানে শিক্ষকতা পেশা অব্যাহত রাখেন।
১৯৯৭ খ্রি. অব্দের ২ ডিসেম্বর শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অতপর ভারতের পার্বত্য ত্রিপুরায় আশ্রিত শরণার্থীদের প্রত্যাগমন প্রক্রিয়া শুরু হয়। ভদন্ত জ্ঞানধ্বজা মহাথেরো ভারত থেকে ফিরে এসে রাঙ্গামাটি আনন্দ বিহারে অন্তেবাসী ভিক্ষু হিসেবে আশ্রয় নেন।
মোনঘরে অবস্থান: ১৯৯৮ খ্রি. অব্দের ডিসেম্বরের দিকে তিনি মোনঘরে গমন করেন। মোনঘর কার্যনির্বাহী পরিষদে তাঁকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত করা হয় এবং মোনঘর শিশু সদনের একটি আবাসিক ভবনের দায়িত্বঅর্পণ করা হয়। ২০০৪ খ্রি. অব্দের ৯ জুলাই পর্যন্ত ভদন্ত জ্ঞানধ্বজা মহাথেরো মোনঘর শিশু সদনের নানা পদে অধিষ্ঠিত থেকে এ এতিমখানায় আশ্রিত শিশুদের প্রভুত উপকার সাধন করেন।

ঢাকা শাক্যমুনি: ২০০৪ খ্রি.অব্দের ৯ জুলাই আমি মিরপুরস্থ শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত বনফুল কমপ্লেক্সে ’বনফুল আদিবাসী গ্রিনহার্ট কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করি। ২০০৫ খ্রি. অব্দের জানুয়ারীর প্রথম ভাগে ভদন্ত জ্ঞানধ্বজা মহাথেরো উক্ত কলেজে স্কুল পর্যায়ে ইংরেজী ভার্সনের একজন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ২০০৭ খ্রি. অব্দের ৩১ ডিসেম্বর তিনি উক্ত পদে ইস্তফা প্রদান করে তবলছড়িস্থ রাঙ্গামাটি আনন্দ বিহারে একজন অন্তেবাসী ভিক্ষু হিসেবে স্থায়ীভাবে অবস্থানের লক্ষ্য নিয়ে চলে আসেন। শারীরিকভাবে কিছুটা সুস্থ হলে তিনি রাঙ্গামাটিস্থ ’ঘাগড়া কলেজে’ খন্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। মহাপ্রয়াণের আগ পর্যন্ত তিনি ঐ কলেজে ঐ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

দুঃখ মুক্তির অন্বেষণে ভদন্ত জ্ঞানধ্বজা: ভদন্ত জ্ঞানধ্বজা মহাথেরো মুক্ত বিহঙ্গ সদৃশ ভিক্ষু জীবনে একাগ্রচিত্তে শীল-সমাধি ও প্রজ্ঞার সাধনায় সদা সর্বদা বিমোহিত থাকার চেষ্টা করেছিলেন। জ্ঞানান্বেষণ ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। অলস সময় কাটানো তাঁর ধাতে ছিল না। দিন ও রাতের অধিকাংশ সময় বই ছিল তাঁর একান্ত সঙ্গী। শুধু বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের বই নয়, নানা ধরনের জ্ঞানমূলক বই পড়া এবং সংগ্রহ করা ছিল তাঁর একমাত্র শখ। দান-দক্ষিণা হিসেবে প্রাপ্ত সমুদয় টাকা তিনি বই কেনায় ব্যয় করেছিলেন বলে আমার ধারণা। তাঁর মহাপ্রয়াণের পর তাঁর সংগ্রহ শালায় দুই সহস্রারাধিক বই পাওয়া যায়। অনেক বই খুবই দুর্লভ- যা আমার গোটা জীবনের সংগ্রহ শালায়ও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ বাংলাদেশের সদস্যভুক্ত সংঘ সদস্যদের মধ্যে শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন বিনির্মাণের লক্ষ্যে কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যৌক্তিক তা নিয়ে তিনি সব সময় ভাবতেন। সময় ও সুযোগ পেলে এ ব্যাপারে তিনি আমার সাথে এবং অপরাপর সংঘ সদস্যদের সাথে আলোচনায় ব্যাপৃত থাকতেন। সংঘের সুনাম সুযশ ও সুকীর্তি জনমানসে বিঘোষিত হলে তিনি পরম পুলক অনুভব করতেন। লোভ-দ্বেষ-মোহের বশবর্তী হয়ে কারো সাথে তাঁকে রাগারাগি করতে দেখা যায়নি। যথালাভে সন্তুষ্ট থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে ভিক্ষু জীবন অতিবাহিত করা ছিল তাঁর জীবনের ধর্ম ও ব্রত। ক্ষুদ্র স্বার্থ চরিতার্থ করার তাগিদে তিনি কারো বিরুদ্ধে সমালোচনা মুখর বা অঙ্গুলি নির্দেশ করতে কখনো দেখা যায়নি। কিন্তু সাংঘিক স্বার্থের ব্যাপারে তিনি আপোষহীন ছিলেন সব সময়।
শ্রুতময়ী ও চিন্তনময়ী জ্ঞান আহরণের পাশাপাশি ভাবনাময়ী জ্ঞান আহরণের ব্যাপারে তাঁর প্রজ্ঞা ও সাধনা ছিল অমলিন। যুগ ধর্ম ও যুগ যন্ত্রণার তাগিদে ভাবনাময়ী জ্ঞান আহরণের অনুষঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামস্থ ভিক্ষু সংঘের মধ্যে ইতিমধ্যে অনেক অনেক মতভেদ ও দ্বিধা-বিভক্তি পরিলক্ষিত হয়। বিশ্ব বিখ্যাত ধ্যানগুরু সত্যনারায়ন গোয়েঙ্কাজীর উদ্যোগে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ভাবনাময়ী জ্ঞানান্বেষণের লক্ষে ১০(দশ) দিনের ধ্যানানুশীলন কোর্স চালু করা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিক্ষু মণ্ডলীর মধ্যে অনেক ধ্যানগুরু বা বিদর্শনাচার্যের আবির্ভাব ঘটেছে। তাঁরা নিজেদেরকে শ্রদ্ধাবান ও শ্রদ্ধাশীলা দায়কদায়িকাদের কাছে অনন্য সাধারণ ধ্যানগুরু হিসেবে প্রতিপন্ন করতে, পরিচয় দিতে দ্বিধা করেন না। আমাদের ভদন্ত জ্ঞানধ্বজা মহাথেরো এরূপ হীন মানসিকতা সম্পন্ন ভিক্ষুদের প্রতি ছিলেন সমালোচনামুখর।
তিনি মনে করতেন দুঃখ মুক্তির লক্ষ্যে ধ্যানানুশীলনের কিছু বিধিবদ্ধ পদ্ধতি রয়েছে। এ পদ্ধতি চিরন্তন, চিরকালীন ও সর্বজনীন। এ পদ্ধতি মানবপুত্র বুদ্ধ কর্তৃক আবিষ্কৃত, নির্দেশিত ও বিধিবদ্ধ। ধ্যানানুশীলনের বিধিবদ্ধ পদ্ধতির বাইরে গিয়ে অনেক ভিক্ষু ইদানীং ধ্যান কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা পূর্বক পুণ্যবান ও পুণ্যবতীদায়ক দায়িকাদের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়াস চালাচ্ছেন। ভদন্ত জ্ঞানধ্বজা মহাথেরো এরূপ চালবাজ ভিক্ষুদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পিছপা হতেন না। এদের বিরুদ্ধে তাঁর কন্ঠ থাকতো সব সময় সোচ্চার।
তাঁর দৃষ্টিতে একজন বিদর্শন সাধক কখনো চালবাজী করতে পারেন না। নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষে সাধারণ দায়ক দায়িকাদের মাঝে নিজেকে আকারে ইঙ্গিতে হলেও মার্গলাভী, অনুবুদ্ধ প্রভৃতি অভিধায় অভিষিক্ত বা অধিষ্ঠিত করার অপপ্রয়াস চালাতে পারেন না। যদি কোন ভিক্ষু বা ধ্যানগুরু বা বিদর্শন সাধক মার্গলাভী হন তাও সাধারণ জনসমক্ষে তা প্রচার না করার জন্য বুদ্ধের কঠোর নির্দেশনা ছিল। কারণ, সাধারণ জনগণ তা বিশ্বাস করলে তো ভালো কথা কিন্তু বিশ্বাস না করলে তাদের পাপ হতে বাধ্য। তাই করুণাঘন বুদ্ধের এরূপ কঠোর নির্দেশনা। প্রাতিমোক্ষের চতুর্থ পারাজিকার মধ্যে রয়েছে-
“যো পন ভিক্খু অনভিজানং উত্তরি মনুসস ধম্মং অত্তুপনাযিকং অসমরিয ঞানদসসনং সমুদাচরেয্য ইতি জানামি, ইতি পসসামী’তি, ততো অপরেন সমযেন সমনুগ্গহিযমানো বা অসমনুগ্গ হিযমানো বা আপন্নো বিসদ্ধাপেক্খো এবং বদেয্য অজানেব আবুসো অব্বং জানামি, অপসসং পস্সামি তুচ্ছং মুসা বিলপিন্তি, অঞ্ঞত্র অধিমানা, অযম্পি পারাজিকো হোতি অসংবাসোতি।”অনুবাদের নির্য্যাস হল এই-যদি কোন ভিক্ষু ধ্যান বিমোক্ষাদি লোকোত্তর জ্ঞান লাভ না করা সত্ত্বেও নিছক লাভ সৎকারের আশায় ধ্যান বিমোক্ষাদি লোকোত্তর জ্ঞান লাভ করেছি বলে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে তবে তার পারাজিকা হতে বাধ্য।
ভদন্ত জ্ঞানধ্বজা মহাথেরো সংঘ সমাজের এসব চালবাজী বিষয়সমূহ মোটেই গ্রহণযোগ্য মনে করতেন না। চরমভাবে নিন্দনীয় মনে করতেন। তাঁর দৃষ্টিতে শ্রাবকবুদ্ধ, অনুবুদ্ধ ও মার্গলাভীদের পরচর্চা, পরনিন্দা, পরছিদ্রান্বেষণ বাদ দিয়ে আত্মচর্চা, আত্ম সমীক্ষা, আত্মশুদ্ধি, আত্ম অন্বেষণ, আত্ম উন্নয়নে সদা সর্বদা নিরত থাকা উচিত। তিনি মনে করতেন- স্বঘোষিত শ্রাবকবুদ্ধ, অনুবুদ্ধ ও মার্গলাভীদের বাক্য সংযমতা কঠোরভাবে থাকা উচিত। তাঁর মতে যার বাক্য সংযমতা নেই সে কোন ধরনের মার্গলাভী? তাঁর মতে কায় সংযম সাধু, চক্ষু সংযম সাধু, ঘ্রাণ সংযম সাধু, কর্র্ণ সংযম সাধু, জিহ্বা সংযম সাধু এবং মনো সংযম সাধু। এ ষড় সংযম যে মার্গলাভী অনুপুঙ্খ সুসংরক্ষণ করতে পারে সেই না সত্যিকার সাধু!
ভদন্ত জ্ঞানধ্বজা মহাথেরো মাত্র ৫৫ (পঞ্চান্ন) বছর বয়সে আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিলেন। তাঁর মতো একজন উচ্চশিক্ষিত ইংরেজী জ্ঞানে দক্ষ ভিক্ষুকে হারিয়ে পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের তাবৎ ভিক্ষু মণ্ডলীসহ অবিভক্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের পুণ্যবান ও পুণ্যশীলা দায়ক দায়িকারা আজ দিশেহারা ও হতাশ। পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের যে অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে তা কত যুগ পরে পূরণ হবে তা ভবিতব্যই জানে।

শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ: ২০১২ খ্রি. অব্দের ২৬ নভেম্বর মধ্যরাত্রে রাঙ্গামাটি সদর হসপিতালে তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটে। মহাপ্রয়াণের সময়কাল রাত ২ ঘটিকা। অন্ত্যেষ্ঠিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়েছিল রাঙ্গামাটি সদরস্থ বহু পুণ্যভূমি আনন্দ বিহারে শত ভিক্ষু ও সহস্র পুন্যার্থীদের অংশগ্রহণে ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে ।

লেখক : ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথের, সভাপতি(সাবেক), পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ বাংলাদেশ

Please follow and like us:
error0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close