অঙ্গুত্তর নিকায়ের ‘সময়’ সুত্রের আলোকে পাঁচটি পরিস্থিতিতে কোনভাবে সদ্ধর্ম সম্যকভাবে আচরণ করা সম্ভব নয়। যদিও আচরণ করা হয় এর প্রকৃত ও প্রত্যক্ষ ফল বা উপকার লাভ সম্ভব হয় না। সেই পাঁচটি কি কি?

১. জরাগ্রস্ত
২. ব্যাধিগ্রস্ত
৩. দুর্ভিক্ষ বা অভাব
৪. দস্যুভয় বা অশান্ত পরিস্থিতি
৫. সংঘভেদ অথবা সংঘের মধ্যে বিরোধ হলে।

১. জরাগ্রস্ত বা অতিশয় বৃদ্ধ হলে ধর্ম আচরণ সহজ সাধ্য হয় না। সহজসাধ্য না হওয়ার দরুন মার্গাদি সত্য জ্ঞান লাভ হয় না। কেবল মার্গ নয় সাধারণ ধর্মাচরণ যেমন দান, শীল, ভাবনাদি আচরণও সঠিকভাবে হয় না। এটি সম্যকভাবে ধর্ম আচরণের প্রথম অসময়। শুধু ধর্ম নয় অর্থ-বিত্ত, যশ-কীর্তি ইত্যাদি যুবক বয়সে সংগৃহীত না হলে বৃদ্ধকালে কঠিন পরিস্থিতিতে জীবন যাপন করতে হয়। ধর্মপদ জরা বর্গে তাই বুদ্ধ বলেছেন-
“আচরিত্বা ব্রহ্মচরিযং অলদ্ধ যোব্বনে ধনং
জীন্নকোঞ্চেব ঝাযন্তি খীনমচ্ছে’ব পল্ললে।“
যোবনকালে ব্রহ্মচর্য পালন ও সম্পত্তি অর্জন না করলে মৎস্যবিহীন জলাশয়ে জীর্ণ বকের অবস্থানের ন্যায় বৃদ্ধ বয়সে অনুতাপ, অনুশোচনায় কাল যাপন করতে হবে।

২. ব্যাধিগ্রস্ত হলে সদ্ধর্ম আচরণ সহজ হয় না। ব্যাধি হল দেহের শত্রু। ব্যাধিগ্রস্ত মানুষ সবসময় মানসিকভাবে পর্যুদস্ত। তাদের মন সবসময় দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন। তাই ধর্ম আচরণও তাদের মনে কোনভাবেই শান্তি দিতে পারে না। তাছাড়া একজন অসুস্থ ব্যক্তি যখন শয্যাশায়ী হয় তার দ্বারা কোনরূপ ধর্মচর্যা সম্ভব হয়ে ওঠেনা। রোগ যন্ত্রণায় কাতর ব্যক্তি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারে না, অংশগ্রহণ করলেও দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করতে পারে না, মন বসাতে পারে না। তাইজন্যে বুদ্ধ বলেছেন- “আরোগ্য পরম লাভ”। সুস্থ দেহ-মন সকল সুখের উৎস।

৩। দুর্ভিক্ষ বা অভাবের সময় সঠিকভাবে ধর্মাচরণ সম্ভব হয়না। বুদ্ধ বলেছেন-“সব্বে সত্তা আহারট্ঠিতিকা” সকল প্রাণি আহারে জীবন ধারণ করে। কায়িক মানসিক শক্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য আহারের মাধ্যমে আসে। সঠিক আহার শরীরকে পরিপুষ্ট করে তোলে। পরিপুষ্ট দেহ মন দান-শীল-ভাবনাদি পুণ্য কর্ম, শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞাময় নিরাপদ ব্রহ্মচর্য উদযাপনে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করে। এছাড়াও দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডে নিয়মিত খাওয়া পড়া থাকা চাই। তাই জীবনে সর্বাগ্রে অন্নসংস্থান, পরে অন্যকিছু। যে ক্ষুধার্ত তার কাছে ধর্মীয় অমৃত বাণী কিংবা অন্যান্য সদুপদেশ গালি সদৃশ। এমন আখ্যান ধর্মপদেও পরিলক্ষত হয়। একসময় বুদ্ধ জেতবনে অবস্থানকালীন এক ক্ষুধার্ত ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে ধর্ম শ্রবণের প্রার্থনা করেন। কিন্তু বুদ্ধ দেখলেন লোকটি ক্ষুধার্ত। এমতাবস্থায় তাকে ধর্ম দেশনা করলে কোন লাভ হবে না। বরঞ্চ তাকে কিছু খাওয়ানো উচিত। পরে ভিক্ষুদের ডেকে লোকটিকে কিছু খাওয়ানোর নির্দেশ দেন। ভিক্ষুরা তাঁদের পিন্ডপাতের অবশিষ্ট লোকটিকে খাওয়ালেন। লোকটির ভোজন শেষ হলে বুদ্ধ ধর্মদেশনা করলেন- “জিঘচ্ছা পরমা রোগা…” ক্ষুধা কঠিনতম রোগ…। দেশনাবসানে লোকটি স্রোতাপত্তি মার্গফল লাভ করেছিল।

৪। অশান্ত পরিস্থিতি বলতে পারিবারিক, সামাজিক তথা দেশের রাজনৈতিক অশান্ত পরিস্থিতিকে বলা হয়েছে। এ সময় সঠিকভাবে ধর্মাচরণ সম্ভব হয় না। যেখানে জীবন নিরাপত্তাহীন এক সংকটময় পরিস্থিতে অতিবাহিত হয় সেখানে সদ্ধর্ম আচরণ বাধাগ্রস্ত হয়। ভয়-ভীতিহীন, স্বাচ্ছন্দ্যময় অনুকুল পরিবেশই ধর্মীয় তথা আর্থ-সামাজিক জীবনের উন্নতি ঘটায়। যে জায়গায় সবসময় হানাহানি, যুদ্ধবিগ্রহ লেগে থাকে সেখানে সাধারণ মানুষ কেন ভিক্ষু শ্রামণদের ধ্যান ভাবনা এমনকি বসবাস করাও ভীতিজনক হয়ে ওঠে। তাইজন্যে বুদ্ধ অশান্ত পরিস্থিতিকে ধর্মাচরণে অসময় বলেছেন।

৫। সংঘের মধ্যে বিরোধ হলে শাসন সদ্ধর্ম তথা জাতিগত অনেক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সংঘের ঐক্য শক্তি সমস্ত শক্তির ঊর্ধ্বে। তথাগত বুদ্ধ তাই বলেছেন- “সুখা সঙ্ঘস্স সামগ্গি সমগমগানং তপো সুখো।“ সংঘের একতা সুখকর এবং ঐক্যবদ্ধগণের তপস্যা বা যাবতীয় কর্মকাণ্ড সুখদায়ক হয়।
সংঘের মধ্যে বিরোধ বা বিবাদের পরিণতি ভয়াবহ। এ সময় পূণ্যের পরিবর্তে পাপ বেশী অর্জিত হয়। পক্ষে বিপক্ষে হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা বৃদ্ধি পায়। কায় মনো বাক্যে অমৈত্রি চর্চিত হয়। বিদ্বেষপূর্ণ জিহ্বাস্ত্রে একে অপরকে বিদ্ধ করে, ধর্মীয় আলাপ আলোচনায় পঞ্চধর্ম বিবর্জিত হয়। লাভ সৎকারে নিমজ্জিত হয়ে একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বি করে তোলে। বিভিন্নভাবে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলে। এমতাবস্থায় সত্যধর্ম উপলব্ধি হয় না। সঠিক ধর্মাচরণ ব্যাহত হয়। মার্গাদি কুশল ধর্ম লাভ তো হয় না পরন্তু সাধারণ শীলাচরনেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।

তথাগত বুদ্ধ সংঘের তিনটি পরিষদের কথা বলেছেন যেমন- বিশিষ্ট পরিষদ, বিরোধি পরিষদ ও সামঞ্জস্য পরিষদ। বিশিষ্ট পরিষদ গঠন করতে না পারলেও অন্তত সামঞ্জস্য পরিষদে অবস্থান করা উচিত। কখনও বিরোধি পরিষদ সৃষ্টি না করতে তথাগত বুদ্ধ আমাদের উপদেশ দিয়েছেন। তাইজন্যে তথাগত বুদ্ধ বলেছেন এই পাঁচ পরিস্থিতে হাজার প্রচেষ্টা করলেও সত্যধর্ম লাভ করা যায় না।

লিখেছেন: Bhikkhu T Rattan Joti

Please follow and like us:
error0

By pbsb

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *